অষ্টগ্রাম-বাজিতপুর ডুবো সড়ক: সংস্কারের অংশেই খানাখন্দ, তিন উপজেলার হাজারো মানুষের ভোগান্তি

কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত অষ্টগ্রাম উপজেলার সঙ্গে জেলা শহরের প্রথম সড়ক যোগাযোগের মাধ্যম অষ্টগ্রাম-বাজিতপুর ডুবো সড়কটি এখন নিজেই ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৪ সালে চালু হওয়া এই সড়কের সংস্কার করা অংশগুলোতেই কংক্রিট ও সিমেন্ট উঠে গিয়ে কয়েক শ খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এসব ভাঙা স্থান দিয়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলছে, আর ভোগান্তির শিকার হচ্ছে তিন উপজেলার হাজারো মানুষ।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের অধীনে ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনটি সেতুসহ ১২৬ কোটি টাকা বরাদ্দে নির্মিত হয় ১৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই ডুবো সড়ক। বর্ষার সময় সড়কটি পানিতে ডুবে যায়, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি নেমে গেলে সড়ক যোগাযোগ পুনরায় চালু হয় — এ কারণেই এর নাম হয়েছে ডুবো সড়ক।
অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন — এই তিন হাওর উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ভৈরবসহ শহরাঞ্চলে যাওয়ার প্রধান ও দ্রুততম পথ এই সড়ক। এই পথে প্রতিদিন রোগীসহ কয়েক হাজার মানুষ যাতায়াত করেন এবং তিন উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারের পণ্য পরিবহন করা হয়।
সড়কটি নির্মাণের মাত্র তিন বছরের মধ্যেই এর প্রায় ৯ কিলোমিটার অংশ সংস্কার করতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আরসিসি ঢালাইয়ের ওপর মাত্র এক থেকে দেড় ইঞ্চি পুরত্বের সিসি ঢালাই দিয়ে সেই সংস্কার করা হয়েছিল। এখন সেই ঢালাইয়ের পাথর, কংক্রিট ও বালু উঠে গিয়ে খানাখন্দের সৃষ্টি হচ্ছে, আর সংস্কার করা স্থানগুলোতেই দুই বছর ধরে ভাঙন চলছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অষ্টগ্রাম উপজেলার বাহাদুরপুর থেকে কারানল সেতুর পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত এবং বাজিতপুর উপজেলার হুমায়ুনপুরের পাঁচরাস্তার মাথা থেকে হুমায়ুনপুর মোড় পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙা সড়কে যানবাহনকে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে, আর ঝাঁকুনিতে চালক ও যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৭ কিলোমিটার সড়কটি নির্মাণের কার্যাদেশ পেয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসইএল, এমবিইএল ও জেআই জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেড; তবে ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে ঢাকার এক্সপেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ারস লিমিটেড।
একসময় এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অটোরিকশা চালাতেন হাফিজ মিয়া। তিনি বলেন, বাধ্য না হলে তিনি এই পথে গাড়ি নিয়ে আসেন না। ঝাঁকুনির কারণে গাড়ির ব্যাটারি বেশি নষ্ট হয়, জয়েন্ট প্রায়ই ছুটে যায় এবং সময়ও লাগে বেশি। তাঁর দাবি, হয় সড়কটি মেরামত করা হোক, না হয় ওপরের সিসি ঢালাই উঠিয়ে দেওয়া হোক — তাতে সড়ক কিছুটা সমান হবে এবং শান্তিতে চলাচল করা যাবে।
ভৈরব থেকে চিকিৎসা নিয়ে অষ্টগ্রামে বাড়ি ফেরা আনোয়ার খাতুন বলেন, অটোরিকশায় বসলে ঝাঁকুনিতে তাঁর কোমরের ব্যথা বাড়ে, সারা শরীর ব্যথা করে। তাঁর কথায়, এই সড়ক ঠিক না করলে তাঁদের চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়বে।
কিশোরগঞ্জ সড়ক ও জনপথ দপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৮ সাল পর্যন্ত। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানই সড়কটি সংস্কার করেছিল; এরপর সওজ আর কোনো সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেনি।
অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, ডুবো সড়কটি সংস্কার করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। তিনি আশা করেন, তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, তাঁর জানা মতে এই সড়কে আলাদা করে কোনো সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি; সম্ভবত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই মেরামত করেছিল। খানাখন্দের কারণে মানুষের ভোগান্তির কথা তিনি জেনেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য পাঠানো হবে এবং অন্তত সাময়িক মেরামতের মাধ্যমে সড়কটি যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা গেলে তা দ্রুত করা হবে; অন্যথায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।



