প্যারিস চুক্তির দশ বছর: তাপমাত্রার লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেলেও জলবায়ু আলোচনা কি এগোচ্ছে?

প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরের দশ বছর পর বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি সীমিত রাখার মূল লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে। তবু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ চুক্তি অগ্রগতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করছে।
২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং এক বছর পর তা কার্যকর হয়। সরকারগুলো বছর বছর অঙ্গীকার করেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখবে। অথচ দুই বছর ধরে তাপমাত্রা সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
জাতিসংঘ কয়েক সপ্তাহ আগে জানিয়েছে, তাদের সবচেয়ে আশাবাদী অনুমানেও এখন তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রায় ১ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে পারে।
গত বছর ব্রাজিলের আমাজন বন্দর বেলেমে অনুষ্ঠিত ২০২৫ সালের জলবায়ু সম্মেলনের আগে আলোচনার এক অদ্ভুত পদ্ধতি দেখা গিয়েছিল। ব্রাজিলের আয়োজকরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই আলোচনার টেবিল থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন—প্রতিটি দেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, যা প্যারিস চুক্তির মূল ভিত্তি।
ব্রাজিলের দাবি ছিল, এসব পরিকল্পনা জাতীয় সরকারের বিষয়, আলোচনার নয়। সম্মেলনের ঠিক আগে গ্লোবাল সাউথের এক অভিজ্ঞ আলোচক বলেছিলেন, 'সেক্ষেত্রে এটি খুব ছোট একটি কপ হবে। আলোচনার কিছুই নেই।'
আরেক উন্নয়নশীল দেশের কূটনীতিক বলেন, 'তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় আলোচনার কোনো আগ্রহ নেই। দেশগুলো এতে যুক্ত হবে না।'
সম্মেলনটি একটি চুক্তি দিয়ে শেষ হয়েছিল, যদিও তা খুব কম মানুষই পছন্দ করেছিল। কিন্তু ব্রাজিলের সিদ্ধান্তের ফলে সৃষ্ট ফাটল গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বছরের সম্মেলন শুরুর মুখে এটা স্পষ্ট যে, প্যারিস চুক্তি ও বিশ্বজুড়ে জলবায়ু কার্যক্রম এক অচলাবস্থায় পৌঁছেছে।
বিশাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সম্মেলন হলের বাইরের অনেকের কাছেও প্রশ্ন উঠছে, এ বছরের সম্মেলন শুরুর মুখে এর আসলে কী অর্থ আছে?
প্যারিসের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ, যার কেন্দ্রে রয়েছে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা। এর বাইরে আলোচনার প্রক্রিয়াগুলো অত্যন্ত জটিল এবং নিজেরাই সমস্যা তৈরি করে। চুক্তিটি কীভাবে ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন করা হবে, সেই 'রুলবুক' নিয়ে আলোচনা করতেই পাঁচ বছরের বেশি সময় লেগেছিল।
সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিতে পাস করতে হয়—এই নিয়ম খারাপ পক্ষগুলোকে অবাধ সুযোগ দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিত্ররা—সৌদি আরব, রাশিয়া, ভেনেজুয়েলা ও কিছু পেট্রোরাষ্ট্র—প্রায়ই বিভিন্ন ব্যবস্থা ভেটো দেয় এবং অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করে।
১৯৯২ সালে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘের কাঠামো কনভেনশন স্বাক্ষরের পর জীবাশ্ম জ্বালানিকে সরাসরি মোকাবিলা করতে ৩০ বছরের বেশি সময় লেগেছিল। ২০২৩ সালে দুবাইয়ে কপ২৮-এ দেশগুলো প্রথমবারের মতো 'জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার' বিষয়ে একমত হয়েছিল, কিন্তু কোনো সময়সীমা বা তা সমর্থনকারী নীতিমালা নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র, যারা আজ নির্গত প্রতি আট টন কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় এক টনের জন্য দায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে প্যারিস থেকে সরে গেছে।
প্রক্রিয়াটিকে সমর্থনকারী উন্নত বিশ্বের অনেক দেশও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কপ৩১-এর সহ-আয়োজক অস্ট্রেলিয়া জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানি বন্ধের কোনো শেষ তারিখ নির্ধারণ করেনি; অপর সহ-আয়োজক তুরস্ক কার্বন নির্গমন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাজ্য একটি গ্যাসক্ষেত্র খুলছে এবং নতুন একটি তেলক্ষেত্রের কথা ভাবছে, জার্মানি বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির লক্ষ্য বাদ দিয়েছে এবং নবায়নযোগ্য গরম করার আইন বাতিল করেছে। এদিকে অধিকাংশ ধনী দেশ দরিদ্রদের জন্য জলবায়ু অর্থায়নে তাদের অবদান কমাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কথা, প্যারিসের ধীরগতির সময়সূচি ২০১৫ সালে হয়তো ঠিক মনে হয়েছিল, যখন তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বাড়ছিল। আজ বৃদ্ধির হার প্রতি দশকে ০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং এখনো তা বাড়ছে।
ক্লিনটন হোয়াইট হাউসের সাবেক জলবায়ু উপদেষ্টা পল ব্লেডসো, যিনি এখন আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে রয়েছেন, বলেন, 'কপ ও প্যারিসের কাঠামো গোলকধাঁধার মতো, আমলাতান্ত্রিক এবং শেষ পর্যন্ত হতাশাজনক। এগুলোকে সহজ করার সময় এসেছে হয়তো।'


