ইরান যুদ্ধ কীভাবে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয় এনে দিল, বিশ্লেষণে ব্যাখ্যা
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় ও তার অর্থনৈতিক পরিণতি ডেমোক্র্যাটদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
ওই বিশ্লেষণে বলা হয়, এই সপ্তাহে ইরানের পাল্টা জবাব আধুনিক আমেরিকান ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিকে নিয়ে গেছে। ডেমোক্র্যাটরা এখন আগামী দুই বছরের জন্য সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—দুটি কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে।
বিশ্লেষকের মতে, শুধু ইরান যুদ্ধে ব্যর্থতাই ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ের কারণ নয়। বরং যুদ্ধটি আমেরিকান সমাজের অনেক অসন্তোষকে প্রতিফলিত করেছে এবং আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যার ফলে ক্ষুব্ধ ও ভীত নাগরিকেরা ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের প্রত্যাখ্যান করে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দিয়েছেন।
বিশ্লেষণে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভুল ধারণা করেছিলেন যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দেশটিকে নতজানু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত করবে।
কিন্তু ইরান টিকে থাকে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আরব ভূখণ্ডে পাল্টা আঘাত হানে এবং যুদ্ধের বেদনাদায়ক অর্থনৈতিক মূল্য প্রতিটি আমেরিকান পরিবারে পৌঁছে দেয়।
বিশ্লেষকের মতে, এতে ওয়াশিংটন অপমানিত হয়েছে, কারণ এতে প্রকাশ পেয়েছে যে আমেরিকার সামরিক শক্তি—ট্রাম্পের আচরণ ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মতোই—অনিয়মিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই অকার্যকর।
ইরান যুদ্ধ আরও নানা পরিণতি ডেকে আনে, যা প্রতিটি আমেরিকানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং গণতন্ত্র, সমতা ও আইনের শাসনের মতো জাতীয় মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
ইরানের যে পদক্ষেপটি সাধারণ আমেরিকানদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল, তা হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ। এর ফলে মুদিখানা, পেট্রল, ডিজেল, ভ্রমণ, বেশির ভাগ আমদানি পণ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যায়।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় তাঁদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বা নির্ধারণী বিষয় ছিল।
মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের রাজনৈতিক নেতা, অবকাঠামো, বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা এবং সামরিক স্থাপনায় কয়েক মাস ধরে নৃশংস হামলা চালানো হলেও ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়নি বলে বিশ্লেষণে বলা হয়।
বরং ইরানের পাল্টা হামলায় আরব উপদ্বীপ ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে বা খালি করে দেওয়া হয়। আরব দেশগুলোর জ্বালানি ও পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষতি হয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং দাম আরও বেড়ে যায়।
বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভারসাম্য স্পষ্ট হয়ে যায়—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর যে কষ্ট চাপিয়েছিল, তার সমান কষ্ট পৌঁছে যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি পরিবারে এবং ইরানের ওপর হামলায় সহায়তা করা অন্যান্য দেশেও।
ইরান যুদ্ধ আমেরিকান সামরিকবাদের গুরুতর ত্রুটিও প্রকাশ করে দেয়, যা সাধারণ আমেরিকানদের বিভ্রান্ত, হতাশ ও অনেক ক্ষেত্রে অপমানিত করে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, ট্রাম্প আমেরিকানদের বারবার প্রকাশ করা ইরানে হামলার বিরোধিতা উপেক্ষা করেন। সিবিএসের ভোট-পরবর্তী জরিপে নিশ্চিত হয় যে ভোটাররা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন—এর অকার্যকর সামরিকবাদ এবং অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব—দুটোর কারণেই।
বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন আইন ও সাধারণ আমেরিকানদের মতামতের প্রতি যে অবজ্ঞা দেখিয়েছে, তাতে অনেক ভোটার ক্ষুব্ধ হন, যাঁরা তাঁদের সাংবিধানিক অধিকারকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেন। অনেক ভোটার রিপাবলিকানদের প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ ট্রাম্প ২০২৪ সালে অপ্রয়োজনীয় বিদেশি যুদ্ধ শেষ করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা তিনি আন্তরিকভাবে পালন করেননি বলে তাঁরা মনে করেন।
বিশ্লেষণে বলা হয়, ট্রাম্প স্পষ্ট, ধারাবাহিক বা বিশ্বাসযোগ্য কোনো কৌশলগত লক্ষ্য ছাড়াই ইরানে হামলা চালান। হামলার মূল কারণ হিসেবে তিনি যা বলেছিলেন, তা হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা—যদিও বিদ্যমান মার্কিন ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শন এবং গোয়েন্দা মূল্যায়নে বারবার বলা হয়েছে, এমন সম্ভাবনা আসন্ন নয়।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকের উপসংহার, ইরান যুদ্ধই ছিল সেই ঘটনা, যা আমেরিকানদের দৈনন্দিন জীবনে যুদ্ধের মূল্য পৌঁছে দেয় এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোটারদের ক্ষোভকে জোরালো করে তোলে।

