হালাল শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে একক কাঠামো ও নির্ভরযোগ্য সনদের দাবি
আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি তৈরি পোশাক, চামড়াজাত সামগ্রী, প্রসাধনী ও ওষুধসহ বহুমুখী পণ্যের হালাল সার্টিফিকেশনের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বৈশ্বিক এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আস্থার সংকট, দ্বৈত সার্টিফিকেশনের জটিলতা, কাঁচামালের উৎস শনাক্তকরণের সীমাবদ্ধতা এবং একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালার অনুপস্থিতি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। শনিবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘ইনভেস্টস মিটআপ ৩.০’ অনুষ্ঠানের ‘হালাল শিল্পে বিনিয়োগ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় এ খাতের প্রসারে একক প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা ও নির্ভরযোগ্য মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার পারভেজ উল্লেখ করেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কিংবা বিএসটিআই—কোনো সংস্থাই এখনো ব্যবসায়ীদের মাঝে শতভাগ আস্থা অর্জন করতে পারেনি। উদ্যোক্তাদের বিভ্রান্তি দূর করতে সব পক্ষকে এক ছাতার নিচে এনে একটি পৃথক হালাল ইনস্টিটিউট বা বিশেষায়িত বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তনের ধারা তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু চূড়ান্ত পণ্যের মান নয়, কাঁচামালের আদি উৎস এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়ার তথ্যও নিবিড়ভাবে যাচাই করছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্তপূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক ও চামড়া খাতে এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হয়ে উঠবে, যা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত অঙ্গীকার জরুরি।
চামড়াজাত পণ্যের কাঁচামালের উৎস শনাক্তে জটিলতা এবং কোন সংস্থা থেকে সনদ নিতে হবে তা নিয়ে উদ্যোক্তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্বের কথাও সংলাপে উঠে আসে।
সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ার বিতর্ক প্রসঙ্গে বিএসটিআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক এস এম ফেরদৌস আলম জানান, যে কর্তৃপক্ষই অনুমোদন দিক না কেন আন্তর্জাতিক নির্ধারিত প্রটোকল ও শরিয়াহ বিধিমালা অনুসরণ করা আবশ্যক। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় বিএসটিআই এ কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছিল এবং তাদের আধুনিকায়িত হালাল পরীক্ষাগার ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন লাভ করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই।
তবে ভিন্ন মত পোষণ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল সার্টিফিকেশন বিভাগের পরিচালক ড. এ কে এম বদরুল আহসান জানান, ২০২৩ সালে প্রণীত জাতীয় হালাল সার্টিফিকেশন নীতিমালা এবং সরকারের দাপ্তরিক কার্যবণ্টন অনুযায়ী হালাল মান ও সনদ প্রদানের একক এখতিয়ার ইসলামিক ফাউন্ডেশনকেই দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ‘হালাল শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ বিষয়ক গবেষণাপত্রে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. মমিনুল ইসলাম তুলে ধরেন যে, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির ব্যাপ্তি পৌঁছেছে প্রায় ৭ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
গবেষণায় বলা হয়, বার্ষিক গড়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে ২০৩৪ সাল নাগাদ এই আন্তর্জাতিক বাজারের আকার দাঁড়াবে ১২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে এই খাত, যার মূল চালিকাশক্তি বিশ্বের প্রায় ১৯০ কোটি মুসলিম ভোক্তা।
গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯৪৩ মিলিয়ন ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানি সম্ভব। বর্তমানে দেশে ৩০১টি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে ৮০২টি হালাল পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণভাবে প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার কারণে দেশীয় পর্যায়েও এই শিল্পের একটি সমৃদ্ধ ভোক্তাভিত্তি রয়েছে।
প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের এই বিশাল সম্ভাবনা ধরতে হলে সনদ প্রক্রিয়ায় আস্থা ফেরানো এবং একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালার অধীনে সব পক্ষকে এক কাঠামোয় আনা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।



