ধান গবেষণার পুকুর লিজ দিয়ে মাছ বিক্রি: টিকিট ১০ হাজার টাকা, টাকা গেল নেতাদের পকেটে

গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) গবেষণাকাজে ব্যবহৃত পুকুরটি নিয়ম ভেঙে ইজারা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সেখানে চাষ করা মাছ শ্রমিকনেতারা বিক্রি করে দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। জনপ্রতি ১০ হাজার টাকার টিকিটের মাধ্যমে এসব মাছ বিক্রি করা হয়েছে। তবে এই টাকা জমা হয়নি ব্রির তহবিলে।
ব্রির খামারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্রির প্রধান কার্যালয়ের শ্রমিক কলোনিতে অবস্থিত পুকুরটি মাছ চাষ ও গবেষণার পানি সংরক্ষণের কাজে ব্যবহারের কথা। মাছ চাষের পর উৎপাদিত মাছ শ্রমিকদের মধ্যে ন্যায্যমূল্যে বিক্রির নির্দেশনা রয়েছে। তবে পুকুরটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অনুমতি নেই।
ব্রি সূত্রে জানা গেছে, নির্দেশনা উপেক্ষা করে পুকুরটি প্রায় দুই লাখ টাকায় লিজ দেওয়া হয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর সরকারি ছুটির দিনে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকায় টিকিট বিক্রির মাধ্যমে পুকুরে বড়শি দিয়ে মাছ ধরা হয়েছে।
এভাবে মাছ বিক্রি এবং পুকুরকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ঘটনায় ব্রি কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাছ বিক্রির অর্থের ভাগ-বাঁটোয়ারা কারা পেয়েছে, তা নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গবেষণা সংস্থাটির একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছেন, পুকুর লিজ ও মাছ ধরার টিকিট বিক্রির ঘটনার সঙ্গে ব্রির শ্রমিক নেতা মো. আলমগীর হোসেন এবং এআরডি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মুকুল জড়িত রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিকনেতা মো. আলমগীর হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, 'এই পুকুরের মাছ বিক্রির টাকায় আমাদের ক্লাব পরিচালনা করি।' নিজেদের অর্থ খরচ করে পুকুরে মাছ চাষ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
আলমগীর হোসেন বলেন, '২০০৯ সালে মাছ বিক্রির ঘটনায় রাজনৈতিক কারণে ১০ জন শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা হয়। এই পরিবারগুলো ১৭ বছর খেয়ে না খেয়ে ছিল। ওই দিনের মাছ বিক্রির টাকা তাদের ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আর কিছু অর্থ ক্যারম বোর্ডসহ ক্লাবের বিনোদন সরঞ্জাম কেনায় খরচ করা হয়েছে।'
একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করে তাঁদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও দাবি আলমগীরের।
ব্রির পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের মে মাস থেকে সংস্থাটিতে মহাপরিচালক নিয়োগের ইস্যু ধরে অস্থিরতা শুরু হয়। পরে ১৫ জুলাই মো. রফিকুল ইসলাম ব্রির মহাপরিচালক নিযুক্ত হলেও অস্থিরতা কাটেনি; বরং সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও অস্থিরতা বেড়েছে। কিছু ব্যক্তি নিয়ম ভেঙে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো অপকর্ম করছেন। এ সময় একাধিক কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে। অনিয়মের ঘটনাগুলো বর্তমান মহাপরিচালকের প্রশ্রয়ে ঘটছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রির মহাপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম গত বুধবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, 'শুষ্ক মৌসুমে এই পুকুরের পানি গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হয়। আশপাশের কৃষিজমিতে পুকুরের পানি দিয়ে সেচ দেওয়া হয়। এই পুকুর বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ নেই।'
ব্রির মহাপরিচালক আরও বলেন, বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। দেশে ফিরে ঘটনার সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
২০০৯ সালে পুকুর লিজ এবং মাছ বিক্রির একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রির ১০ জন শ্রমিকের চাকরি চলে গিয়েছিল। খোঁজ নিয়ে বর্তমান ঘটনার সঙ্গে ১৭ বছর আগের মাছ বিক্রির যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, মহাপরিচালকের ফেরার পর এই অনিয়মের তদন্ত হবে কি না এবং যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।




