যে ১০ আমলে আল্লাহ বেশি খুশি হন

পৃথিবীর জীবনে মানুষ কতভাবেই না অন্যকে খুশি করার চেষ্টা করে। কখনো সম্পদ ব্যয় করে, কখনো নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে, আবার কখনো প্রিয় মানুষের মন রক্ষায় নানা ত্যাগ স্বীকার করে। অথচ যে মহান সত্তার সন্তুষ্টির ওপর মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা নির্ভরশীল, সেই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার চিন্তা কতটুকু আমাদের মনে জাগ্রত থাকে?
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড় বিষয়। এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা তাওবা, আয়াত ৭২) কোরআন ও হাদিসের আলোকে এমন দশটি আমলের কথা তুলে ধরা হলো, যেসব আমলে আল্লাহ বেশি খুশি হন।
প্রথম আমল আন্তরিকভাবে তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে পাপ ও ত্রুটির শিকার হয়। কিন্তু আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা সে নয়, যে কখনো ভুল করে না; বরং সে, যে ভুল করার পর নিজের অপরাধ উপলব্ধি করে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২২২) আর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবায় ওই ব্যক্তির চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যে মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া তার বাহন ফিরে পায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৪৭)
দ্বিতীয় আমল ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায় করা। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো তাঁর ফরজ বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করা। অনেক মানুষ নফল ইবাদতে আগ্রহী হলেও ফরজ ইবাদতের ব্যাপারে উদাসীন থাকে, অথচ ফরজ আমলের বিকল্প কোনো নফল আমল হতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের তো কেবল এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (সুরা বাইয়িনাহ, আয়াত ৫) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা যেসব কাজের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো সেই কাজগুলো, যা আমি তার ওপর ফরজ করেছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৫০২)
তৃতীয় আমল তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অবলম্বন করা। আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় না তার সম্পদ, বংশ, পদমর্যাদা কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে। বরং আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যার অন্তরে রয়েছে সবচেয়ে বেশি তাকওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত ১৩)
চতুর্থ আমল মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ ও সদাচার করা। মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া, অসহায়কে সহযোগিতা করা এবং মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন—এসবই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৯৫)
পঞ্চম আমল ধৈর্য ও বিপদে অবিচল থাকা। মুমিনের জীবনে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও বিপদাপদ আসবেই। কখনো অসুস্থতা, কখনো দারিদ্র্য, কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনা, আবার কখনো নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। এসব পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৬) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের বিষয়টি কতই না বিস্ময়কর! তার প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর।’ তিনি বলেন, মুমিন সুখ-শান্তি লাভ করলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর বিপদে আক্রান্ত হলে ধৈর্য ধারণ করে, সেটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৯)
ষষ্ঠ আমল আল্লাহর পথে ব্যয় করা ও অসহায়দের সহযোগিতা করা। সম্পদ মানুষের জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। এই সম্পদ শুধু নিজের ভোগবিলাসে ব্যয় করার জন্য নয়; বরং অসহায়, দরিদ্র, এতিম ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যও। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় ব্যয় করে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তের জন্য সহজতা সৃষ্টি করে, আল্লাহ তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সহজতা সৃষ্টি করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৯৯)
সপ্তম আমল রাগ সংবরণ ও মানুষকে ক্ষমা করা। মানুষের প্রতি রাগ, ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা অনেক সময় সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। অথচ যে ব্যক্তি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যকে ক্ষমা করে দেয়, সে আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৪) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দান করলে সম্পদ কমে না। ক্ষমা করার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার সম্মানই বৃদ্ধি করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৮)
অষ্টম আমল আল্লাহর ওপর ভরসা করা। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মানুষ চেষ্টা করবে, পরিকল্পনা করবে, উপায়-উপকরণ গ্রহণ করবে; কিন্তু ফলাফলের ব্যাপারে নির্ভর করবে একমাত্র আল্লাহর ওপর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৯)
নবম আমল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ইনসাফ করা। নিজের স্বার্থ, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব কিংবা শত্রুতার কারণে কারো প্রতি অন্যায় করা যাবে না; বরং সব অবস্থায় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত ৪২)
দশম আমল নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা। ফরজ ইবাদত আদায়ের পাশাপাশি তাহাজ্জুদ, নফল নামাজ, নফল রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ও দোয়া—এসব আমল বান্দাকে আল্লাহর আরো কাছাকাছি নিয়ে যায়। সহিহ বুখারির হাদিসে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৫০২)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।


