কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টারের ফেলে দেওয়া তাপে ঘর গরম করছে ডেনমার্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ডেটা সেন্টারগুলো যেভাবে দ্রুত বাড়ছে, তাতে বিশ্বের জ্বালানি সংকট আরও গভীর হচ্ছে। কিন্তু ডেনমার্কের প্রকৌশলীরা এসব কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ ‘বর্জ্য তাপ’ কাজে লাগানোর একটি উপায় খুঁজে পেয়েছেন, যে তাপ সাধারণত বাইরের বাতাসে হারিয়ে যায়।
বিশ্বজুড়ে এখন ১২ হাজার ৫০০টির বেশি ডেটা সেন্টার রয়েছে এবং প্রতিদিন আরও নতুন কেন্দ্র চালু হচ্ছে। এগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি অবকাঠামো ও সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। শত শত বিলিয়ন লিটার পানি খরচের পাশাপাশি এসব ব্যবস্থা বৈশ্বিক বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর বিপুল চাহিদা তৈরি করছে এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নেও বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ডেটা সেন্টারগুলো ৪৮৫ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের দেড় শতাংশের সমান—অর্থাৎ জার্মানির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমান। এই সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে ৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার ক্রমবর্ধমান অংশই আসবে এআই উন্নয়ন থেকে।
জাতিসংঘের ইউরোপীয় অর্থনৈতিক কমিশন সতর্ক করে বলেছে, গুগল, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো বড় ক্লাউড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত সম্প্রসারণ এবং সেগুলো চালাতে প্রয়োজনীয় বিশাল ডেটা সেন্টারগুলো বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ‘ক্রমবর্ধমান হুমকি’ হয়ে উঠছে।
ডেটা সেন্টারের বিস্তার নিয়ে ক্ষোভও ছড়াচ্ছে। নেদারল্যান্ডসে শুক্রবার আমস্টারডামের কাছে মাইক্রোসফটের নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে টেক্সাসে ইলন মাস্ক তাঁর এআই ও স্পেসএক্স কার্যক্রম কর ছাড়ের সুবিধা নিতে সরিয়ে নেওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন। এ সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনে টেক্সাসের ভোটাররা প্রায় ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর জেমস টালারিকোকে নির্বাচিত করেছেন, যদিও মাস্ক রিপাবলিকান পার্টির প্রচারে শত শত মিলিয়ন ডলার ঢেলেছিলেন।
ডেনমার্কের সন্ডারবর্গে দক্ষিণ ডেনমার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি বছরের মে মাসে চালু হওয়া বিটেন সুপারকম্পিউটার দেশজুড়ে একাডেমিক গবেষণার জন্য এআই সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি গভীর তথ্য বিশ্লেষণ ও জটিল বৈজ্ঞানিক সিমুলেশনের জন্য প্রয়োজনীয় এআই কম্পিউটিং শক্তি সরবরাহ করে।
কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য সুপারকম্পিউটার ও এআই ডেটা সেন্টারের মতো বিটেনের সক্ষমতার সঙ্গে তার বিদ্যুৎ খরচও সমান বিশাল। দিনে ২৪ ঘণ্টা এর বিশেষায়িত প্রসেসরগুলো কাজের চাপ সামলাতে গিয়ে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে।
এখন সেই তাপ কেবল বাইরে ছেড়ে না দিয়ে ডেনিশ প্রকৌশল কোম্পানি ড্যানফসের তৈরি উন্নত তরল শীতলীকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য তাপের শতভাগই পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থা প্রচলিত এয়ার কন্ডিশনিং ও ফ্যানের জায়গা নিয়েছে, যেগুলো তাপ বাইরের বাতাসে ছেড়ে দিত।
নতুন ব্যবস্থায় শীতলকারক তরল সরাসরি উচ্চ তাপমাত্রার প্রসেসিং চিপগুলোর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং বর্জ্য তাপ পুরোপুরি শোষণ করে নেয়। সেই তাপ এরপর সরাসরি সন্ডারবর্গের পৌর জেলা তাপ সরবরাহ নেটওয়ার্কে পাঠানো হয়, যা শহরের ৭৫ হাজার বাসিন্দাকে উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে।
ড্যানফস ক্লাইমেট সলিউশনসের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিয়ান স্ট্র্যান্ড বলেন, আমরা যখনই কোনো ছবি তুলি বা কোনো নথি আপলোড করি, তখনই একটি ডেটা সেন্টারে প্রক্রিয়াকরণ চালু হয়। তিনি বলেন, ‘এতে তাপ তৈরি হয়, যা আমাদের সরাতে হয়। বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়ার শেষে ডেটা সেন্টার থেকে মূলত গরম পানির একটি কল পাওয়া যায়। সেই গরম পানি শুধু ঘর গরম করতেই নয়, শিল্প প্রক্রিয়াতেও ব্যবহার করা যায়।’
বিশ্বজুড়ে শিল্প প্রক্রিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বায়ুমণ্ডলে হারিয়ে যাচ্ছে। স্ট্র্যান্ড জানান, ড্যানফসের হিসাবে ইউরোপজুড়ে এক বছরে নষ্ট হওয়া তাপ দিয়ে পুরো প্যারিস শহরকে ৪৮ বছর চালানো যেত। আর বিশ্বের জ্বালানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই অতিরিক্ত তাপ হিসেবে বেরিয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি ডেটা সেন্টার রয়েছে—বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার। এগুলো দেশের বিদ্যুতের ৫ শতাংশ খরচ করে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র খুব সামান্যই তাপ পুনরুদ্ধার করে, কারণ সেই তাপের ব্যবহারের জায়গা নেই।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি ও জলবায়ু নীতির অধ্যাপক জান রোজেনো বলেন, ‘আমাদের ডেটা সেন্টার সেখানেই বানানো উচিত, যেখানে তার তাপ ব্যবহার করা যায়—শুধু যেখানে জমি সস্তা, সেখানে নয়।’ তিনি জানান, বর্জ্য তাপ ধরার ক্ষেত্রে স্ক্যান্ডিনেভিয়া এগিয়ে রয়েছে। ডেনমার্কের ওডেনসে মেটার ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ১০০ গিগাওয়াট ঘণ্টা তাপ পুনরুদ্ধার করে, যা ৬ হাজার ৯০০টি বাড়ির জন্য যথেষ্ট। আর সুইডেনের স্টকহোম ২০১৪ সাল থেকে ডেটা সেন্টারের তাপ তাদের নেটওয়ার্কে দিচ্ছে।
ড্যানফসে বর্জ্য তাপের অন্যান্য উৎসও দেখানো হচ্ছে—সুপারমার্কেটের ফ্রিজ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে কারখানা ও বর্জ্য পানি শোধনাগার পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলীরা সম্প্রতি সন্ডারবর্গ হাসপাতালের কার্বন-নিবিড় দুটি গ্যাস বয়লারের জায়গায় একটি হিট পাম্প ব্যবস্থা বসিয়েছেন, যা এমআরআই স্ক্যানারের মতো চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং অপারেশন থিয়েটার, ওয়ার্ড ও করিডরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থেকে বর্জ্য তাপ ধরে রাখে।
এই তাপ আগে কুলিং টাওয়ারের মাধ্যমে বাইরে ছেড়ে দেওয়া হতো। এখন হাসপাতালটি বছরের নয় মাস জ্বালানিতে স্বনির্ভর এবং জেলা তাপ সরবরাহ নেটওয়ার্কে তাপ ফেরত দিতে পারে, ফলে গরমের বিলে বড় অঙ্কের সাশ্রয় হচ্ছে। সন্ডারবর্গ হাসপাতালের কারিগরি সেবা বিভাগের প্রধান লাসে বো ম্যাডসেন বলেন, ‘এটি করার পেছনে খুব ভালো ব্যবসায়িক যুক্তি ছিল। প্রকল্পটি দুই বছরের মধ্যে নিজের খরচ উঠিয়ে নেবে এবং এর ফলে আমরা রোগীর সেবা ও স্ক্যানারের মতো নতুন যন্ত্রপাতিতে আরও বেশি অর্থ খরচ করতে পারব।’




