ডেমোক্র্যাটদের জয়ে ইউক্রেনের হাত শক্ত হতে পারে, তবে অনিশ্চয়তা কাটেনি
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বড় জয়ের পর ইউক্রেন আরও বেশি মার্কিন সহায়তার আশা করছে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টা ও সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।
মঙ্গলবারের ভোটে ডেমোক্র্যাটরা যে ‘ব্লু ওয়েভ’ বা নীল ঢেউয়ে জয় পেয়েছে, তাতে নতুন কংগ্রেসের উভয় কক্ষই তাদের নিয়ন্ত্রণে যাবে। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর একটি নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে ইউক্রেনের সেনাদের কাছে এ ফলাফলের খুব একটা গুরুত্ব নেই। পূর্ব ইউক্রেনের আহত ড্রোন টেকনিশিয়ান কিরিলো কিয়েভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রাশিয়ার একটি গ্লাইড বোমা তাঁর বাঙ্কারে আঘাত হানার পর তিনি গুরুতর আঘাত পান।
৩৭ বছর বয়সী কিরিলো বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে শিখে গেছি কীভাবে আমেরিকার ওপর নির্ভর না করে চলতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প আমাদের এতবার হতাশ করেছেন, রাশিয়ার কাছে আমাদের বিক্রি করে দিয়েছেন, তবু আমরা দাঁড়িয়ে আছি এবং রুশদের মোকাবিলা করছি। আমরা আর আমেরিকার অর্থ ও অস্ত্রের ওপর নির্ভর করি না। গোটা বিশ্ব এখন আমাদের ড্রোন কিনতে চায়।’ যুদ্ধকালীন নিয়ম অনুযায়ী তিনি আল জাজিরাকে তাঁর পদবি প্রকাশ না করতে বলেছেন।
ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটন ধীরে ধীরে ইউক্রেনের যুদ্ধের খরচ বহন করা কমিয়ে দিয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন থেকে ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত আর্থিক ও সামরিক সহায়তার পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৫ সাল থেকে মার্কিন সহায়তা একেবারে কমে এসেছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত কিয়েভ সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলের ‘লিগ্যাসি পাইপলাইন’ থেকে মাত্র ৮২০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পেয়েছে। সরবরাহ শেষ হলে এসব চুক্তির ব্যয় আরও ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। ইউরোপ আর্থিক বোঝার বেশিরভাগ নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই ইউরোপ ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার দিয়েছে। তবে জার্মান থিংক ট্যাংক কিয়েল ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের অস্ত্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে মার্কিন কোম্পানিগুলো থেকে।
কিছু সহায়তা আবার চালু হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক এবং ট্রাম্প পরিবারের অভিযুক্ত দুর্নীতি নিয়ে ব্যাপক তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তদন্তে রাশিয়ার রাজনীতিবিদ, গোয়েন্দা ও অলিগার্কদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হবে। এর মধ্যে রয়েছেন উমর ক্রেমলেভ, যিনি মে মাসে বাহামায় ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের বিবাহোৎসবের জন্য লাখ লাখ ডলার দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে জানিয়েছে, ৩ জানুয়ারি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তারা সমন জারি করবে এবং ইউক্রেন সংক্রান্ত নথিসহ নির্বাহী বিভাগের নথি প্রকাশে বাধ্য করবে।
কিয়েভভিত্তিক থিংক ট্যাংক পেন্টার প্রধান ভলোদিমির ফেসেনকো আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইউক্রেনের অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে। তবে আমাদের দ্বিদলীয় সমর্থন ধরে রাখতে হবে।’ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নিয়ে বলেন, ‘আমাদের দ্বিদলীয় সমর্থন রয়েছে।’ তিনি বলেন, রিপাবলিকানদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ, তবে ডেমোক্র্যাটরা ইউক্রেনকে সমর্থন ও সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে খুব স্পষ্টভাবে তাঁদের অবস্থান জানিয়েছে।
তবে কংগ্রেস থেকে আরও সমর্থন পাওয়া সহজ হবে না। কারণ ইউক্রেনকে সমর্থন করা বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান তাঁদের আসন হারিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক, যিনি কংগ্রেসনাল ইউক্রেন ককাসের সহসভাপতি ছিলেন এবং কিয়েভের অন্যতম দৃঢ় সমর্থক হিসেবে পরিচিত। আরও রয়েছেন নেব্রাস্কার ডন বেকন ও নিউইয়র্কের মাইক ললার, যিনি ইউক্রেন সাপোর্ট অ্যাক্টের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
একই সময়ে কিয়েভকে ওয়াশিংটনে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিতে হবে। সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ওলহা স্তেফানিশিনাকে ‘অবৈধ সম্পদ অর্জন’ তদন্তের মধ্যে আগস্টে বরখাস্ত করা হয়। রাষ্ট্রদূত কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করেন এবং কিয়েভের সঙ্গে যোগাযোগ ও আইনপ্রণেতাদের সফরের আয়োজন করেন। ফেসেনকো বলেন, ‘সে কারণে সবার আগে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিতে হবে।’
ডেমোক্র্যাটদের কিছু সমর্থক ট্রাম্পকে অভিশংসনের দাবি জানালেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে ইউক্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফেসেনকো বলেন, ‘ঈশ্বর না করুন, ইউক্রেন যেন তৃতীয় অভিশংসনের কেন্দ্রবিন্দুতে না আসে।’ ট্রাম্পের প্রথম অভিশংসন হয়েছিল ২০১৯ সালে। অভিযোগ ছিল, তিনি কিয়েভকে বাইডেন ও তাঁর ছেলে হান্টারের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে চাপ দিয়েছিলেন। হান্টার দুর্নীতির অভিযোগে জড়িত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি বুরিসমার বোর্ডে ছিলেন। ডেমোক্র্যাটরা বলেছিল, ট্রাম্প তখন ৩৯ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা আটকে রেখেছিলেন, যখন কিয়েভের রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবিলায় মার্কিন অস্ত্রের খুব প্রয়োজন ছিল।
নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগে ট্রাম্প সম্ভবত ইউক্রেনকে দ্রুত শান্তি চুক্তি মেনে নিতে চাপ দেবেন। কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক ইগার তিশকেভিচ আল জাজিরাকে বলেন, ‘রাশিয়া যখন ছাড় দিতে রাজি নয়, তখন যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার দ্রুততম উপায় হলো ট্রাম্প কিয়েভের হাত মুচড়ে দেবেন। সে কারণে আগামী দুই মাস বেশ জটিল হবে।’ তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের এখন উভয় কক্ষে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাই তিনি নতুন কংগ্রেসের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের মাত্রা কমাতে নিজের নীতির কার্যকারিতা দেখানোর চেষ্টা করবেন।
নতুন কংগ্রেসকে একটি দ্বিধার মুখোমুখি হতে হবে, যা ইউক্রেনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও মার্কিন সহায়তা আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। তিশকেভিচ বলেন, ‘একদিকে ইউক্রেনকে সমর্থন অব্যাহত রাখার রাজনৈতিক অঙ্গীকার রয়েছে, অন্যদিকে ইউক্রেনের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রশ্ন ও অভিযোগের অবসান ঘটানোর রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’
মস্কোপন্থি কণ্ঠগুলো ইতিমধ্যে রাশিয়ার সম্ভাব্য ক্ষতি হিসাব করছে। কমারসান্ত পত্রিকায় লেখা এক মতামতে মস্কোভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আন্দ্রে কর্তুনভ লিখেছেন, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে মস্কোর সঙ্গে সংলাপ স্থাপনে বাধা দিতে দ্বিগুণ চেষ্টা করবে, কিয়েভকে সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তা পুনরায় চালুর দাবি জানাবে, ইউক্রেন ইস্যুতে আটলান্টিক ঐক্য পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেবে এবং রাশিয়া ও তার প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দেবে। মস্কোভিত্তিক বিশ্লেষক মালেক দুদাকভ গ্যাজেটা ডট আরইউকে বলেন, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প কীভাবে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করছেন, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করবে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, মস্কোর পররাষ্ট্রনীতি ‘অন্য দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার ওঠানামার ওপর নির্ভর করে না’। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছেন। আমরা আন্তরিকভাবে আশা করি, তিনি তাঁর শান্তি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।’



