উরুগুয়ে সফর শেষে আর্জেন্টিনায় পোপ লিও, মিলেইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ
পোপ লিও চতুর্দশ রোববার উরুগুয়ে সফর শেষ করছেন। দেশটির স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত ক্যাথলিক ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি সফরের সমাপ্তি টানছেন। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ দেশটিতে গির্জার ভূমিকার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন তিনি।
উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওর উত্তরে ফ্লোরিডা শহরে যাচ্ছিলেন পোপ লিও। সেখান থেকে তিনি যাবেন আর্জেন্টিনায়, যা তার তিন দেশের দক্ষিণ আমেরিকা সফরের দ্বিতীয় ধাপ। ক্যাথলিক গির্জা লিবার্টারিয়ান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের কঠোর ব্যয় সংকোচন কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করায় এ ধাপটি রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে সংবেদনশীল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উরুগুয়ে সফরের শেষ অনুষ্ঠানে পোপ লিও তেত্রিশের কুমারী মেরির (ভার্জিন অব দ্য থার্টি-থ্রি) উৎসব পালন করছিলেন। প্রতি বছর হাজার হাজার তীর্থযাত্রী কুমারী মেরির ছোট কাঠের মূর্তির সামনে প্রার্থনা করতে এ শহরে আসেন।
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ৩৩ জন স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমিক গুয়ারানি মূর্তিটি সংগ্রহ করেছিলেন এবং ১৮২৫ সালের ২৫ আগস্ট ফ্লোরিডায় ব্রাজিল সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা ঘোষণার সময় তা তাদের সঙ্গে ছিল।
প্রায় চার দশকের মধ্যে প্রথম পোপ হিসেবে উরুগুয়ে সফর করলেন পোপ লিও। দেশটি পরবর্তী দশকগুলোতে গভীরভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, এমনকি কখনো কখনো ধর্মবিরোধী পথে গেলেও ক্যাথলিক গির্জা যে জাতি হিসেবে তাদের পরিচয়েরই অংশ, তা মনে করিয়ে দেওয়ার আশা করছেন তিনি।
দক্ষিণ আমেরিকা সফরের দ্বিতীয় ধাপ শুরুর আগে একটি শেষ বার্তা দিতে চাইছিলেন পোপ লিও। গত ১৩ অক্টোবর ফুসফুস থেকে ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার অপসারণের অস্ত্রোপচার হলেও তিনি সফর চালিয়ে যাচ্ছেন। সফরের শেষ গন্তব্য পেরু, যা তার দ্বিতীয় স্বদেশ।
৭১ বছর বয়সী পোপ লিও অনুষ্ঠানগুলোতে সুস্থ ও প্রাণবন্ত দেখাচ্ছেন। তিনি জোরে গান গাইছেন, সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন এবং পোপমোবাইলে জনতাকে অভিবাদন জানাচ্ছেন। রোম সময়ে মধ্যরাত পেরিয়ে যাওয়া অনুষ্ঠানসহ কোনো অনুষ্ঠানই তিনি সংক্ষিপ্ত করেননি।
চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জুডাইক স্টাডিজের অধ্যাপক লুইস বাহামন্ডেস বলেন, ‘এ সফর লিওকে কেবল আধ্যাত্মিক অর্থে নয়, বরং আরও ব্যাপক অর্থে একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। তিনি সংঘাত বা উত্তেজনা এড়িয়ে যান না; বরং একটি শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গি দেন এবং ব্যাপকভাবে সম্মানিত কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত হন।’
মিলেই বুয়েনস আয়ার্স বিমানবন্দরে পোপ লিওকে স্বাগত জানাবেন এবং এরপর তারা একসঙ্গে ঐতিহ্যবাহী স্বাগত অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন ও বক্তব্য বিনিময় করবেন। মিলেইয়ের কঠোর ব্যয় সংকোচন ব্যবস্থা সামাজিক ব্যয় ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়ায় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে তিনি আলিঙ্গন করায় এ সাক্ষাৎ উত্তেজনাপূর্ণ হতে পারে।
মিলেইয়ের ব্যাপক ব্যয় সংকোচনের কারণে আর্জেন্টিনার গির্জার নেতাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ব্যাপকভাবে টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে। গির্জার নেতারা অভিযোগ করেছেন, তার সরকার দরিদ্রদের চাহিদার চেয়ে অর্থনৈতিক গোঁড়ামিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মিলেই বাস্তব হিসাবে আর্জেন্টিনার স্বাস্থ্য বাজেট ৪৮ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় পরিকল্পিত ব্যয় সংকোচন, যা সংকটপ্রবণ দেশটিতে প্রায় সর্বজনীন গর্বের বিষয়, শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের মিত্রদের মতো মিলেইয়ের সরকারও এসব ব্যয় সংকোচনকে আর্জেন্টিনার সমস্যাগ্রস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং সরকারি আমলাতন্ত্রের জালিয়াতি ও অপচয় দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনায় দারিদ্র্যের হার ছিল জনসংখ্যার ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ।
মিলেই সীমিত নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিনিয়োগ ও ডেটা সেন্টার আকৃষ্ট করেছেন। পোপ লিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা মানবতা ও পরিবেশের জন্য যে হুমকি তৈরি করছে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন এবং এর উন্নয়নে কঠোর, আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণযোগ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছেন।
আর্জেন্টিনায় পোপ লিও তার পূর্বসূরি পোপ ফ্রান্সিসের অসমাপ্ত কাজ সম্পূর্ণ করছেন। আর্জেন্টিনার জেসুইট ধর্মযাজক, বুয়েনস আয়ার্সের সাবেক আর্চবিশপ ফ্রান্সিস তার ১২ বছরের পোপত্বকালে কখনো নিজ দেশে ফেরেননি, যা বন্ধু ও শত্রু উভয়কেই বিস্মিত করেছিল।
নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডেভিড ল্যান্টিগুয়া বলেন, ‘আর্জেন্টিনায় ফ্রান্সিস ও তার উত্তরাধিকার নিয়ে অনেক মতবিরোধ রয়েছে।’ বুয়েনস আয়ার্সে তার সময়কালের বেশিরভাগ বিতর্কের সূত্রপাত হয়, যখন সাবেক কার্ডিনাল হোর্হে মারিও বেরগোলিও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দেশে কখনো কখনো বিভাজনমূলক পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
বেরগোলিও ছিলেন বস্তির ধর্মযাজক, যিনি দরিদ্রতম ও সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের পক্ষে কথা বলতেন—আর্জেন্টিনার সেই অংশের মানুষই মিলেইয়ের সামাজিক ব্যয় সংকোচনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ল্যান্টিগুয়া বলেন, ‘আমি মনে করি লিওর ক্ষেত্রেও আমরা সে ধরনের উত্তেজনা দেখব—ফ্রান্সিস যে সেবার কাজ রেখে গেছেন, সেটাই।’ পেরুতে দরিদ্র মানুষের মধ্যে দুই দশক ধর্মপ্রচারক হিসেবে কাজ করা পোপ লিও অনেকটাই ফ্রান্সিসের আদলে একজন যাজক, এবং তার পোপত্বের জন্য তিনি প্রয়াত পোপের কাছে ঋণী।



