চুইংগামের ডিএনএতে ৪০ বছর পর ধরা পড়ল খুনি, দুই নারী হত্যায় যাবজ্জীবন

চুইংগাম থেকে পাওয়া ডিএনএর সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে ৪০ বছরের পুরোনো দুটি হত্যা মামলার সমাধান হয়েছে। আসামি মিচেল গ্যাফ ২০২৬ সালের এপ্রিলে জুডিথ 'জুডি' উইভার ও সুসান ভেসিকে হত্যার দায় স্বীকার করেন এবং মে মাসে স্নোহোমিশ কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টের এক বিচারক তাকে ৫০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
১৯৮৪ সালের জুনে এভারেট শহরে উইভারকে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে বাঁধা অবস্থায়, যৌন নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। তদন্তকারীরা জানান, গ্যাফ তাঁর পোশাক ছুরি দিয়ে কেটে আগুন লাগিয়ে প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা করেছিলেন। অ্যাপার্টমেন্টটি ছিল রাকার অ্যাভিনিউয়ের পাশে।
তদন্ত প্রথমে উইভারের বাগদত্ত বিল রিচার্ডসের দিকে মোড় নেয়। উইভারের মেয়েরা তদন্তকারীদের জানান, দম্পতির সম্পর্ক ছিল অস্থির। রিচার্ডস ১৯৯৪ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত সন্দেহভাজন হিসেবে ছিলেন।
ভেসিকে ১৯৮৪ সালের ২ জুন, তাঁর ২১তম জন্মদিনের সকালে এভারেটের বাড়ির ভেতরে মারধর করে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়।
মামলার মোড় ঘোরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে, যখন এভারেট পুলিশ বিভাগের গোয়েন্দা সুসান লোগোথেটি চুইংগামের ছলে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে উইভারের মামলার প্রমাণ আধুনিক ডিএনএ পরীক্ষায় পাঠান। ওই নমুনার ভিত্তিতে ২০২৪ সালের মে মাসে গ্যাফকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ডিএনএ প্রমাণ তাঁকে ভেসির হত্যার সঙ্গেও যুক্ত করে।
এভারেট পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গ্যাফের দেওয়া বক্তব্য তদন্তকারীদের সংগৃহীত প্রমাণের সঙ্গে মিলে গেছে।
আদালতের নথিতে গ্যাফের যৌন সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস উঠে এসেছে। ১৯৭৯ সালে এক জুরি তাঁকে প্রথম-ডিগ্রি চুরি ও দ্বিতীয়-ডিগ্রি হামলায় দোষী সাব্যস্ত করে। সেসময় তিনি এক নারীর হাত বেঁধে পিস্তল দিয়ে বারবার আঘাত করেন এবং তাঁর মাথা কংক্রিটে ঠুকে দেন। ভুক্তভোগী পালিয়ে বাঁচেন। গ্যাফ প্রবেশন ও ওয়ার্ক রিলিজ পান।
প্রবেশনে থাকা অবস্থায় ১৯৮৪ সালে তিনি এভারেটের এক বাড়িতে ঢুকে ছুরির মুখে ১৪ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোরী বোনকে ধর্ষণ করেন। এক বিচারক তাঁকে ১৩৮ মাসের ব্যতিক্রমী সাজা দেন এবং প্রবেশন বাতিল করে সাজাগুলো ধারাবাহিকভাবে ভোগের নির্দেশ দেন।
কারাগার থেকে তাঁর নির্ধারিত মুক্তির আগে ওয়াশিংটন কর্তৃপক্ষ তাঁকে যৌন সহিংস অপরাধী হিসেবে নিরাপদ স্থাপনায় আটকে রাখার আবেদন করে। মনোবিজ্ঞান মূল্যায়নের সময় গ্যাফ অশ্লীল ফোনকল ও যৌন নির্যাতনের কথা স্বীকার করেন, যার মধ্যে ছয়টি ধর্ষণও ছিল। এক জুরি রায় দেন, তিনি সিভিল কমিটমেন্টের আইনি মানদণ্ড পূরণ করেন। ১৯৯৮ সালের এপ্রিলে ওয়াশিংটন আপিল আদালত ওই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে সাক্ষ্য দেওয়া এক মনোবিজ্ঞানী গ্যাফের যৌন স্যাডিজম নির্ণয় করেন এবং তিনি পুনরায় অপরাধ করার ঝুঁকিতে আছেন বলে মত দেন। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা পক্ষের এক বিশেষজ্ঞ মনে করেছিলেন, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তিনি নিরাপদে সমাজে বসবাস করতে পারবেন।
২০০৫ সালের মধ্যে রাষ্ট্রের মূল্যায়করা সিদ্ধান্ত নেন, গ্যাফের আর সর্বোচ্চ নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই এবং কম কঠোর পরিবেশে স্থানান্তরের অনুমোদন দেন। ২০০৬ সালে তিনি ম্যাকনিল দ্বীপের স্পেশাল কমিটমেন্ট সেন্টার ছেড়ে সিয়াটলের সোডো এলাকার একটি নিরাপদ হাফওয়ে হাউসে যান।
ওই চুক্তির শর্ত ছিল, স্থাপনার বাইরে গেলে জিপিএস নজরদারি ও তত্ত্বাবধান মানতে হবে। আট বছরের জন্য তাঁকে তাঁর যৌন সহিংস অপরাধীর মর্যাদা চ্যালেঞ্জ করার অধিকারও ছাড়তে হয়। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে আদালত তাঁর যৌন সহিংস অপরাধীর আবেদন খারিজ করে সিভিল কমিটমেন্ট থেকে শর্তহীনভাবে মুক্তি দেন। পরে তিনি অলিম্পিয়ায় 'স্যাম ওয়াইজ প্রাইস' ছদ্মনামে বসবাস করেন।
এই মামলার সঙ্গে যুক্ত নন এমন ফরেনসিক মনোবিজ্ঞানী ও লেখক ড. ক্যাথরিন র্যামসল্যান্ড বলেন, কোনো অপরাধী স্বীকারোক্তি দিয়েও কোনো পরিণতি না পেলে সে উৎসাহিত বোধ করে আবারও একই কাজ করতে পারে। তাঁর ভাষায়, সাজার মেয়াদের বাইরে কাউকে ধরে রাখা কঠিন, কারণ কখনো কখনো প্রমাণ করতে হয় যে সে সম্ভাব্য নয়, বরং আসন্ন বিপদ।
পুলিশ এখন তদন্ত করছে গ্যাফের আরও ভুক্তভোগী আছে কি না। গোয়েন্দা লোগোথেটি বলেন, 'এটি চলমান। আমি একেবারে বিশ্বাস করি আরও ভুক্তভোগী আছে।' তিনি জানান, গোয়েন্দারা গ্যাফের স্বীকারোক্তির বিবরণ ওয়াশিংটনসহ অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের অমীমাংসিত মামলার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন, তবে ২০২৪ সালে গ্রেপ্তার বা ২০২৬ সালে দোষ স্বীকারের পর আর কোনো ভুক্তভোগী বা অপরাধ শনাক্ত হয়নি।
গ্যাফের প্রতিরক্ষা আইনজীবী হিদার উলফেনবার্গার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। গ্যাফের সঙ্গে যুক্ত অন্য সম্ভাব্য ভুক্তভোগী সম্পর্কে তথ্য থাকলে এভারেট পুলিশের টিপ লাইনে (৪২৫-২৫৭-৮৪৫০) যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়েছে।



