হরমুজ সংকটের মধ্যেই মার্কিন এলএনজির সবচেয়ে বড় ক্রেতা হয়ে উঠছে কাতার

ইরান যুদ্ধের আগে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ ছিল কাতার। তারাই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হয়ে উঠছে। অথচ এই দশকের শুরুর দিকে এলএনজি রপ্তানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এই উপসাগরীয় দেশকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছিল।
এই পরিবর্তন ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার কারণে কাতার ও দেশটির অর্থনীতির ওপর নেমে আসা ভয়াবহ বিপর্যয়েরই ফল। অথচ এই দশকের বাকি সময়ের জন্য কাতারের নেওয়া এলএনজি সম্প্রসারণ পরিকল্পনার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালীর সংকট এখনো কাতারের বেশিরভাগ এলএনজি রপ্তানি আটকে রেখেছে, যা তাদের পরিকল্পনাগুলোকে ওলটপালট করে দিয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি জায়ান্ট ‘কাতারএনার্জি’ এখন গত মার্চ মাসে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া তাদের এলএনজি স্থাপনাগুলো মেরামতের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কাতারএনার্জি মার্চ মাসে জানিয়েছিল, ওই হামলায় তাদের ১৭ শতাংশ রপ্তানি সক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে এবং বার্ষিক আয়ে আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
এর সাত মাস পরও কাতার হরমুজ প্রণালী দিয়ে খুব অল্পসংখ্যক পণ্যবাহী জাহাজ পার করতে পারছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট বাজারগুলোতে সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে, যেখানে কাতারের উৎপাদিত এলএনজি পৌঁছানোর কথা ছিল। যদিও তাদের উৎপাদন ক্ষমতাও এখন হ্রাস পেয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি কিছু এলএনজির চুক্তির ক্ষেত্রে কাতারএনার্জি বাধ্য হয়ে পাঁচ বছর পর্যন্ত ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির ঘোষণা দিয়েছে। ফলে হঠাৎ করেই বিক্রয় চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার কারণে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে কাতারকে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, নিয়মিত পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে কাতারের যে নির্ভরযোগ্য ভাবমূর্তি ছিল, তাও আজ সংকটের মুখে পড়েছে।
মূলত হরমুজ প্রণালী দিয়ে এলএনজিবাহী জাহাজের চলাচল বন্ধ থাকায় গত সপ্তাহে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি জায়ান্ট এশিয়া ও ইউরোপে এলএনজি সরবরাহের ওপর বলবৎ থাকা ‘ফোর্স মেজর’ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী এবং কাতারের জ্বালানি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাব্বি গত সেপ্টেম্বরে জানান, তেলের বিপরীতে এলএনজি রপ্তানিকারক দেশগুলো পাইপলাইনের মাধ্যমে এই জ্বালানি পরিবহন করতে পারে না।
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত কাতার অর্থনৈতিক ফোরামের বিশেষ সংস্করণে আল-কাব্বি বলেন, ‘সমস্যা হলো এলএনজি আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য, যা পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহন করা যায় না। আমাদের এটি প্রথমে গ্যাস হিসেবে পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহন করতে হবে এবং তারপর বিশ্বের যেখানেই হোক না কেন, তা গ্রহণকারী টার্মিনালে এসে তরলীকৃত করতে হবে।’
মন্ত্রী আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এর অর্থ হলো নর্থ ফিল্ড সম্প্রসারণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে আমরা কাতারে ইতিমধ্যে যে সুবিধাগুলো তৈরি করছি, তার পাশাপাশি আমাদের অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। এটি কোনোভাবেই অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে পাইপলাইনকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি পুনরায় শুরু করার বিষয়ে এ কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ‘হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাতার স্বাভাবিক কার্যক্রম আবার শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে।’
হরমুজ সংকটের নবম মাসে প্রবেশের সময়ও কাতারের এলএনজি রপ্তানির বড় অংশ আটকে থাকায় দেশটির জ্বালানি অর্থনীতির ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।




