মার্কিন শুল্কের চাপে চীনের ভরসা এখন ইউরোপ

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে নিজেদের পণ্যের জন্য নতুন বাজার খুঁজতে ইউরোপের ওপর ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে উঠছে বেইজিং।
অন্যদিকে, চীনের এই নির্ভরশীলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক বছরে ইউরোপ ও চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যিক নির্ভরশীলতা থাকলেও এখন অবিশ্বাস, বিরোধ ও প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এর পেছনে কাজ করছে কয়েকটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ।
প্রভাবশালী মার্কিন দ্বিমাসিক সাময়িকী দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থেকে লাভবান হয়েছে ইউরোপীয় দেশগুলো। চীনের ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইউরোপীয় পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। অন্যদিকে, ইউরোপের ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে চীনা পণ্য পেয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে ইউরোপের ঘাটতি থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই ছিল। চীনা সরকার রপ্তানিকারকদের ভর্তুকি দেওয়া এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক অনিয়মের অভিযোগে ইউরোপীয় দেশগুলো মাঝেমধ্যে আপত্তি জানালেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো কঠোর অবস্থান নেয়নি।
চীনে লাভজনক ব্যবসা পরিচালনাকারী ইউরোপীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি চায়নি। তবে মূলত চারটি কারণে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে।
প্রথমত, চীনের 'মেড ইন চায়না ২০২৫' কর্মসূচির আওতায় দেশটির উৎপাদনশিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও পণ্যের মান বাড়তে থাকে। এর ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের বাজারেই ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, এই কর্মসূচির আওতায় চীনের উৎপাদন সক্ষমতা অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে যায়। ফলে বাড়তি পণ্য বিক্রির জন্য বিদেশি বাজারের ওপর দেশটির নির্ভরতা বাড়তে থাকে।
তৃতীয়ত, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বাণিজ্যনীতি দেশটির মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত করে। ফলে চীনের বাড়তি পণ্য ইউরোপের বাজারে প্রবেশের প্রবণতা বাড়ে। এতে ইউরোপের বিলাসপণ্য ও উন্নত যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়ে।
চতুর্থত, চীনে একসময় দ্রুত বাড়তে থাকা ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি কমতে শুরু করেছে। এতে ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতারা চীনের বাজারেই তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে।
২০০৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চীনে মার্সিডিজের বিক্রি বছরে গড়ে ২৪ শতাংশ, বিএমডব্লিউর ২০ দশমিক ২ শতাংশ এবং অডির ১২ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করেছে।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে চীনে মার্সিডিজের বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমে যায়। অন্যদিকে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত ১২ মাসে বিএমডব্লিউর বিক্রি কমেছে ২৫ শতাংশ।
এদিকে ইউরোপের বাজারে চীনা পণ্যের আমদানিও বেড়েছে। ২০২৫ সালে চীন থেকে ইইউর পণ্য আমদানি বেড়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। মার্কিন বাজার সংকুচিত হওয়ায় চীনের রপ্তানি ইউরোপের দিকে ঝুঁকছে, আর এই নতুন বাস্তবতাই দুই পক্ষের বাণিজ্য আলোচনার চরিত্র বদলে দিচ্ছে।



