পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ: জ্যেষ্ঠতায় এগিয়ে থাকবেন ২০১২ সাল পর্যন্ত সরাসরি নিয়োগ পাওয়া প্রাথমিক শিক্ষকেরা

জাতীয়করণ করা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি সম্পর্কিত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারপক্ষের করা আপিল মঞ্জুর করে দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ গত ২ জুলাই আপিল মঞ্জুর করে ওই রায় দেন।
২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি রোববার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আইনজীবী মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এর ফলে প্রায় ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা কাটল।
মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের ফলে ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকেরা ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের ওপরে জ্যেষ্ঠতা পাবেন। অর্থাৎ ২০১২ সাল পর্যন্ত সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা জ্যেষ্ঠতায় ওপরে থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, ২০১৩ সাল থেকে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের পরে হবে। কারণ, জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের পূর্বে অর্জিত ৫০ শতাংশ ‘কার্যকর চাকরিকাল’ গণ্য হবে।
আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতার ক্ষেত্রেও পূর্বের অর্জিত ৫০ শতাংশ কার্যকর চাকরিকাল গণ্য হবে এবং তা সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সঙ্গেও প্রযোজ্য হবে। জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের ৫০ শতাংশ কার্যকর চাকরিকাল তাঁদের পদোন্নতি, সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
আইনজীবীদের তথ্য অনুসারে, ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি) বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়, যা ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে দেশের ২৬ হাজার ১৯৩টি বিভিন্ন শ্রেণির বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ করা হয়।
বিধিমালার ৯(১) বিধিতে জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি সংক্রান্ত বিষয়ে উল্লেখ করা হয়। ৯(১) বিধির অংশবিশেষ চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে রিট করেন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা।
রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ১১ মার্চ হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে ৯(১) বিধির ‘এবং ওই তারিখের অব্যবহিত পূর্বে নিয়োগবিধির অধীন শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচে ওই শিক্ষকের অবস্থান নির্ধারণ করা হবে’ অংশটুকু সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হয় এবং ‘কার্যকর চাকরিকাল’ বিবেচনায় রিট আবেদনকারীদের জ্যেষ্ঠতা ও সুবিধাদি দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকারপক্ষ লিভ টু আপিল করে, যা ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ এবং হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতাও স্থগিত করা হয়। এরপর আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে আপিল মঞ্জুর করে রায় দেওয়া হয়।
আদালতে আপিলকারী পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক ও আইনজীবী মুনতাসির উদ্দিন আহমেদ শুনানিতে অংশ নেন। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাহ উদ্দিন দোলন ও মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রমজান আলী শিকদার শুনানিতে ছিলেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেছেন, নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকার সময় জাতীয়করণ করা শিক্ষকদের অতীত চাকরিকালকে ‘কার্যকর চাকরিকাল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকার তাঁদের জ্যেষ্ঠতা গণনার সুযোগ দিয়েছে সম্পূর্ণ নিজস্ব নীতিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে, কোনো বিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতার কারণে নয়। রায়ে আরও বলা হয়, ২০১৩ সালের বিধিমালার ৪ বিধি অনুযায়ী ওই শিক্ষকদের নিয়োগের তারিখ থেকে সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার তাঁদের অতীত চাকরিকাল সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করতে পারত, কারণ জ্যেষ্ঠতা, পেনশন, সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল নির্ধারণের জন্য ওই চাকরিকাল গণনা করায় সরকারি তহবিল থেকে অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়ের বোঝা তৈরি হয়। তবে সরকার শিক্ষার স্বার্থে, ওই শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবং সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সন্নিবেশিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির আলোকে তাঁদের অতীত চাকরিকালকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
রায়ে আরও বলা হয়, বিধি ৯(১)-এ অন্তর্ভুক্ত ‘এবং ওই তারিখের অব্যবহিত পূর্বে নিয়োগ বিধির অধীন শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচে ওই শিক্ষকের অবস্থান নির্ধারিত হবে’ শব্দগুলো কোনোভাবেই অযৌক্তিক বা স্ববিরোধী নয়, অথচ হাইকোর্ট বিভাগ বিধি ৯(১) অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করার সময় শব্দগুলোকে অযৌক্তিক ও স্ববিরোধী বলে বিবেচনা করেছিলেন।



