২০২৮ সালে রাস্তা থেকে চোখ সরিয়েই গাড়ি চালানোর প্রযুক্তি আনতে চায় জেনারেল মোটরস

মার্কিন গাড়ি নির্মাতা জেনারেল মোটরস (জিএম) ২০২৮ সালে এমন প্রযুক্তি আনার পরিকল্পনা করছে, যাতে চালক স্টিয়ারিং হুইল থেকে হাত সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রাস্তা থেকেও চোখ সরিয়ে নিতে পারবেন। কোম্পানিটি বলছে, মহাসড়কে ঘণ্টায় ৭০ মাইল গতিতে চলা গাড়িতে বসে চালক তখন ইমেইলের উত্তর দিতে, কোনো অনুষ্ঠান দেখতে বা ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে যোগ দিতেও পারবেন, আর গাড়ি নিজেই চালানোর কাজ সামলাবে।
এই প্রযুক্তি প্রথম আসবে ক্যাডিলাক এসক্যালেড আইকিউ বৈদ্যুতিক এসইউভিতে। তবে চালকদের নিরাপদে রাস্তা থেকে চোখ সরানোর সুযোগ দেওয়ার আগে জিএমকে এখনও অনেক কিছু প্রমাণ করতে হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গাড়ি হঠাৎ চালকের মনোযোগ চাইলে মানুষ কত দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে কোম্পানিটি; সেই গবেষণা থেকেই ঠিক হবে নিয়ন্ত্রণ নিরাপদে ফিরে নেওয়ার জন্য চালকের কতটা আগাম সতর্কবার্তা প্রয়োজন।
জিএম এরই মধ্যে 'সুপার ক্রুজ' নামে হাত-মুক্ত চালনা ব্যবস্থা দিচ্ছে, যা ক্যাডিলাক, শেভ্রলে, জিএমসি ও বিউইক মিলিয়ে ২০টির বেশি মডেলে পাওয়া যায়। এই ব্যবস্থা উপযুক্ত সড়কে নির্দিষ্ট অবস্থায় স্টিয়ারিং, গতি ও ব্রেকিং সামলাতে পারে। তবে এতে চালককে সব সময় রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় এবং নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।
সুপার ক্রুজের পরের সংস্করণে চোখ-সরানো সুবিধা চালু থাকলে সেই সব সময় তাকিয়ে থাকার শর্তটি আর থাকবে না। জিএম প্রথমে উপযুক্ত মহাসড়কে এই সুবিধা চালু করার পরিকল্পনা করেছে, পরে তা অন্য সড়কেও সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। ব্যবস্থাটি চারপাশ পর্যবেক্ষণে লাইডার, রাডার ও ক্যামেরা ব্যবহার করবে। চোখ-সরানো চালনা কখন পাওয়া যাচ্ছে এবং কখন তা সক্রিয় আছে, ড্যাশবোর্ড ও বাইরের আয়নায় ফিরোজা রঙের আলো জ্বলে তা জানান দেবে।
জিএম বলছে, প্রযুক্তিটি ২০২৮ সালের শুরুতেই আসতে পারে। তবে এর চালু হওয়া নির্ভর করছে আরও উন্নয়ন, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও অন্যান্য শর্ত পূরণের ওপর। পাশাপাশি কোন রাজ্যে এই সুবিধা ব্যবহার করা যাবে, তাও নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের আইনের ওপর।
কোম্পানিটির উচ্চাশা এর চেয়েও বড়। ২১ অক্টোবর জিএম ঘোষণা দিয়েছে, পূর্ণ আকারের এসইউভি ও হালকা পিকআপ ট্রাকেও স্বয়ংক্রিয় মহাসড়ক-চালনা আনা হবে, পেট্রলচালিত গাড়িসহ। এই গাড়িগুলো জিএমের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত মডেলগুলোর মধ্যে পড়ে। তবে বাড়তি ওই মডেলগুলোতে প্রযুক্তিটি কবে পৌঁছাবে, তা এখনও জানায়নি গাড়ি নির্মাতাটি।
চালকদের নিরাপত্তা গাড়ির হাতে ছেড়ে দিতে বলার আগে মানুষ গাড়ি চালানো থেকে মন সরিয়ে নিলে কী হয়, তা বুঝতে চায় জিএম। মিশিগানের ওয়ারেনে কোম্পানিটির গ্লোবাল টেকনিক্যাল সেন্টারে শত শত স্বেচ্ছাসেবী ক্যাডিলাক লিরিকসহ আসল জিএম গাড়িতে উঠে বসেছেন। তবে তাঁরা আসল মহাসড়কে না গিয়ে এমন এক নিমগ্ন সিমুলেটরে ঢুকছেন, যা নানা ধরনের সড়ক পরিস্থিতি তৈরি করে দেখায়। গবেষকেরা সেখানে হঠাৎ যানজটের পরিবর্তন, নির্মাণ এলাকা ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন।
পরীক্ষা চলাকালে সেন্সর চালকদের চোখের নড়াচড়া, হৃদস্পন্দন ও মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে। প্রযুক্তি অপ্রত্যাশিত কিছুর মুখে পড়লে মানুষ কীভাবে আচরণ করে, তা বুঝতে সাহায্য করে এই পরীক্ষা। প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা চালক নিয়ে বন্ধ ট্র্যাক ও সর্বজনীন সড়কেও নিজের স্বয়ংক্রিয় চালনা প্রযুক্তি পরীক্ষা করে জিএম। কোম্পানিটির দাবি, তাদের সিমুলেশন সরঞ্জাম এক দিনেই ১০০ বছরের গাড়ি চালানোর সমতুল্য পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যাতে প্রতিদিনের চালকদের ঝুঁকিতে না ফেলেই বিপজ্জনক পরিস্থিতি যাচাই করা যায়।
পরীক্ষার একটি অংশে অংশগ্রহণকারীদের ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে দেওয়া হচ্ছে, আর গবেষকেরা তাঁদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছেন। খেলাটি আকর্ষণীয় বিভ্রান্তি তৈরি করে; খেলোয়াড়েরা স্কোর বাড়াতে মগ্ন হয়ে পড়েন, ফলে হঠাৎ গাড়ি চালনায় মন ফেরাতে হলে কী হয়, তা মাপার উপায় পান গবেষকেরা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জিএমের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মরিন অগাস্ট বলেছেন, খেলাটি অংশগ্রহণকারীদের কোনো কাজে টেনে নিতে সাহায্য করে, তারপর তাঁদের বাধা দেওয়া হয়।
এই বাধা দেওয়ার মুহূর্তটিই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ঘণ্টায় ৭০ মাইল গতিতে একটি গাড়ি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০৩ ফুট পথ পাড়ি দেয়। মাত্র পাঁচ সেকেন্ড দেরি হলেই গাড়ি ৫০০ ফুটের বেশি পথ এগিয়ে যায়। একটি চলন্ত এসইউভির ভেতরে বসে চালককে বুঝতে হয়, গাড়ি কেন তাঁর সাহায্য চাইছে; সেই বোঝার সময়টুকুই গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে।
এই পরিকল্পনা ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি এমন পরিস্থিতিতে পড়লে কী হবে, যা সে নিরাপদে সামলাতে পারে না। মহাসড়কে ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে পারে, নির্মাণকাজের সময় সড়কের দাগ মুছে যেতে পারে, আবার অন্য কোনো চালকের অপ্রত্যাশিত আচরণও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে চালকদের কতটা সতর্কবার্তা দরকার, জিএমের প্রকৌশলীরা তা নিয়ে গবেষণা করছেন। চালকেরা ব্যবস্থাটির সতর্কসংকেত বোঝেন কি না এবং প্রযুক্তিটিকে বিশ্বাস করতে স্বস্তি বোধ করেন কি না, তাও তাঁরা যাচাই করছেন। তবে চালক তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে না-ও পারেন, সেই সম্ভাবনা ধরেই চোখ-সরানো ব্যবস্থা নকশা করতে হয়। জিএম এখনও প্রকাশ্যে জানায়নি, পরিকল্পিত ব্যবস্থাটি ঠিক কোন কোন পরিস্থিতি সামলাবে কিংবা চালক নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হলে গাড়ি ঠিক কী করবে।
বেশ কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা ইতিমধ্যে মহাসড়কে চালানোর কাজ কমিয়ে আনে এমন ব্যবস্থা দিচ্ছে, তবে তাদের সক্ষমতায় বড় পার্থক্য রয়েছে। ফোর্ডের ব্লুক্রুজ উপযুক্ত সড়কে হাত-মুক্ত চালনা দিলেও চালককে মনোযোগ ধরে রাখতে হয়। টেসলার ফুল সেলফ-ড্রাইভিং (সুপারভাইজড) অনেক চালনার কাজ সামলাতে পারলেও তাতে সক্রিয় মানব তত্ত্বাবধান লাগে। মার্সিডিজ-বেঞ্জ আগে ড্রাইভ পাইলট ব্যবস্থা এনেছিল, যা সীমিত পরিস্থিতিতে শর্তসাপেক্ষে চোখ সরিয়ে চালনার সুযোগ দিত; তবে পরবর্তী প্রজন্মের স্বয়ংক্রিয় চালনা ব্যবস্থা তৈরির পথে কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রে সেই প্রযুক্তি থেকে সরে এসেছে। জিএমের বড় লক্ষ্য হলো মহাসড়কের গতিতে, আরও বিস্তৃত উপযুক্ত সড়কজালে চোখ-সরানো চালনা পৌঁছে দেওয়া এবং এসক্যালেড আইকিউর পর সুবিধাটি আরও মডেলে সম্প্রসারণ করা।
স্বয়ংক্রিয় চালনার এই দৌড়ের পেছনে আর্থিক প্রণোদনাও রয়েছে। গাড়ি নির্মাতারা ক্রমেই উন্নত সুবিধা অর্থের বিনিময়ে সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন হিসেবে দিচ্ছে। অন্তর্ভুক্ত সেবার মেয়াদ শেষ হলে সুপার ক্রুজ চালু রাখতে জিএম এরই মধ্যে মূল্য নিচ্ছে। কোম্পানিটির ২০২৬ সালের আগস্টের হালনাগাদ অনুযায়ী, সুবিধাটিসহ গাড়িতে তিন বছরের সেবা থাকে, এরপর পরিকল্পনা শুরু হয় মাসে ৩৯.৯৯ ডলার থেকে। ভবিষ্যতের চোখ-সরানো প্রযুক্তির মূল্য কত হবে, তা জিএম এখনও ঘোষণা করেনি।




