ইসরায়েলে ভোটগ্রহণ শেষের পথে: অর্ধশতকের সর্বোচ্চ উপস্থিতি, নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ফলাফলে

ইসরায়েলে মঙ্গলবার সকালে সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যোগ্য ভোটারদের ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট দিয়েছেন। ২০২২ সালের নির্বাচনে একই সময় পর্যন্ত ভোট পড়েছিল ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ এবারের উপস্থিতি এরই মধ্যে গত নির্বাচনের মোট ভোটার উপস্থিতিকে ছাড়িয়ে গেছে।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বিকেল ৫টা পর্যন্ত সেনা ভোটারদের উপস্থিতি ৬৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে একই সময়ে ছিল ৬৫ শতাংশ। পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, এবারের ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ওই সময় যারা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবেন, তারা সবাই ভোট দিতে পারবেন। ভোটের সময় বাড়ানোর জন্য নেতানিয়াহুর দল লিকুদের করা একটি আবেদন কমিশন প্রত্যাখ্যান করেছে বলে খবর বেরিয়েছে।
ভোটগ্রহণ শেষ হলেই প্রাথমিক ধারণা দেবে এক্সিট পোল। তবে চূড়ান্ত ফলাফল বুধবার বিকেলের আগে পাওয়া যাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফল ঘোষণার পরপরই ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনের দরকষাকষি শুরু হবে।
এরপর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হার্জোগ দলনেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে যার সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করবেন, তাকে সেই সুযোগ দেবেন; সাধারণত সবচেয়ে বড় দলের নেতাই এই সুযোগ পেয়ে থাকেন। আলোচনা চলাকালে, যা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে, নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর এটাই দেশটির প্রথম সাধারণ নির্বাচন। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন। এরপর গাজায় শুরু হওয়া যুদ্ধে হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৪ হাজার ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর ১২ দিনের যুদ্ধ এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া তেহরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের পরও এটাই প্রথম নির্বাচন। গাজা, লেবানন, সিরিয়া, ইরান ও অধিকৃত পশ্চিম তীর—একাধিক ফ্রন্টে ইসরায়েলি বাহিনী সংঘাতে জড়িত থাকায় পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা ইস্যুই এবারের নির্বাচনে প্রাধান্য পাচ্ছে।
ভোটের দিনে উভয় শিবিরই নিজ নিজ সমর্থকদের কেন্দ্রে টানতে তৎপর ছিল। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ শেষ মুহূর্তে ডানপন্থী ভোটারদের ভোট দিতে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি নজিরবিহীন এবং একটি ‘বিপজ্জনক বামপন্থী সরকার’ ক্ষমতায় আসতে পারে।
নেতানিয়াহু নিজেও ভোট শুরুর পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় পর সমর্থকদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে বলেছেন, প্রতিপক্ষ শিবির ও ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোটার উপস্থিতি বেশি। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদেরও বেশি হতে হবে। আপনাদের সবাইকে ভোটকেন্দ্রে ভিড় করতে হবে। এটা একটা ভাগ্যনির্ধারণী মুহূর্ত।’ দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক।
অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন তালিকার বিশিষ্ট রাজনীতিকেরা ডানপন্থী নেতাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া এবং তাদের ভোটাধিকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিযোগ করেছেন।
জনমত জরিপকারী ও নেতানিয়াহুর সাবেক সহযোগী মিচেল বারাক আল জাজিরাকে বলেছেন, ভোটার উপস্থিতি সত্যিই বেশি এবং সেটা ভালো লক্ষণ। তিনি বলেন, উপস্থিতি সম্ভবত ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক শীর্ষকেও ছাড়িয়ে যাবে, যখন ইসরায়েল বড় যুদ্ধে জড়িত ছিল।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়া নেতানিয়াহু ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। ঘুষ, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালে তিনি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন। ডানপন্থী লিকুদ পার্টির নেতা হিসেবে তিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে আসন পেতে একটি দলকে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। ভোটার উপস্থিতি বেশি হলে এই সীমা অতিক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের সংখ্যাও বেড়ে যায় বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।




