ইসরায়েলের বুথফেরত জরিপে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাল নেতানিয়াহুর জোট, সরকার গঠনে অচলাবস্থা
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের ২৬তম নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশিত বুথফেরত জরিপে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। জরিপ অনুযায়ী, তাঁর জোট ১২০ আসনের নেসেটে প্রায় ৫০টি আসন পেতে পারে, অথচ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট ৫২টি আসন পেতে যাচ্ছে বলে দেখা গেছে। তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে আরব জোট, তারা পেতে যাচ্ছে ১৮টি আসন। কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের সংখ্যা ছুঁতে পারেনি।
আলজাজিরা জানিয়েছে, নেতানিয়াহুর জোট সর্বশেষ নির্বাচনে ৬৪টি আসন পেয়েছিল। সেখান থেকে আসন কমে ৫০-এ নেমে এসেছে। দল হিসেবেও লিকুদ পার্টির অবনমন হয়েছে—গত নির্বাচনে এককভাবে ৩২টি আসন পেলেও এবার তা ২৫-এ নেমে আসতে যাচ্ছে বলে জরিপে দেখা গেছে। তবে একক দল হিসেবে লিকুদই সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডোভ ওয়েক্সম্যান আলজাজিরাকে বলেছেন, বুথফেরত জরিপের তথ্য সঠিক হলে নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকা প্রায় অসম্ভব হবে। তাঁর মতে, লিকুদ একক দল হিসেবে সর্বোচ্চ আসন পেলেও জোটের আসন ২০২২ সালের ৬৪ থেকে ৫০-এ নেমে আসাটাই নেতানিয়াহুর জন্য পরবর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন করে তুলেছে।
গাদি আইজেনকোট বুথফেরত জরিপের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ফল সঠিক হলে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মানুষ নেতানিয়াহুর সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে তাঁর জোটের জন্যও সরকার গঠন সহজ নয়, কারণ নির্বাচনের আগে তিনি জানিয়েছিলেন, আরবদের সঙ্গে জোট করে সরকার গঠন করবেন না।
নেতানিয়াহুর সামনে প্রথম বিকল্প হতে পারে তাঁর বর্তমান ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট পুনর্গঠন। এই জোটে রয়েছে শাস পার্টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম, ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন ওতজমা ইয়েহুদিত এবং বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়নিজম পার্টি। তবে এসব দলের সমর্থন নিয়েও ৬১ আসনের সীমা অতিক্রম করা কঠিন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ওফের উইন্টারের নেতৃত্বাধীন পিপল অব ইসরায়েল পার্টি সংসদে প্রবেশের মতো ভোট পেলে দলটিকে জোটে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে নেতানিয়াহুর সামনে। বিপরীতে দলটি প্রয়োজনীয় ভোট না পেলে তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের হিসাব আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ইসরায়েলের ব্যবস্থায় কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতা করেই সরকার গঠন করতে হয়, তাই ছোট দলগুলোর কয়েকটি আসনও চূড়ান্ত সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আরেকটি আলোচিত বিকল্প হলো বিরোধী নেতা আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টির সঙ্গে সমঝোতা করে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন। আনাদোলু এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, এমন ব্যবস্থায় লিকুদ ও ইয়াশার একই সরকারে অংশ নিতে পারে, এমনকি মেয়াদের একপর্যায়ে দুই নেতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ভাগাভাগির ধারণাও আলোচনায় এসেছে। তবে বিরোধী নেতাদের অনেকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে অনিচ্ছুক, ফলে এই সমঝোতা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নির্বাচনের আগে ইয়াশার পার্টির নেতা মাতান কাহানা দাবি করেছিলেন, লিকুদের কয়েকজন আইনপ্রণেতার সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ রয়েছে এবং তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, লিকুদের কিছু সদস্য নেতানিয়াহুর চেয়ে আইজেনকোটের সঙ্গে বেশি কথা বলছেন। তবে তিনি কারও নাম প্রকাশ করেননি। কাহানা আরও জানিয়েছিলেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা তাঁদের নেই; বরং প্রথমে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠনের কথা ভাবছেন তাঁরা।
সরকার গঠনের সমীকরণে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বুথফেরত জরিপে তাদের সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৭ থেকে ১৮ হতে পারে। তবে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট—উভয় পক্ষই নির্বাচনের আগে আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী পক্ষের কেউ কেউ আরব দলগুলোকে সরকারে না নিয়েও সংসদে তাদের সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ইহাব জাবলিন আলজাজিরাকে বলেছেন, বুথফেরত জরিপ বলছে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, কিন্তু বিরোধীদের সরকার গঠনও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিরোধীরা আলোচনার মাধ্যমে সরকার গঠন করতে না পারলে নতুন সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে যাবেন। আরেক বিশেষজ্ঞের মতে, সৃষ্ট পরিস্থিতিতে কয়েক মাস পর ইসরায়েলে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
বুথফেরত জরিপ চূড়ান্ত ফল নয়। রয়টার্স জানিয়েছে, ভোট গণনা ও আসন বণ্টন শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত ফলের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে—এমন একজন আইনপ্রণেতাকে দায়িত্ব দিতে পারেন। মনোনীত ব্যক্তি সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় পাবেন। কোনো পক্ষই সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, আর সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত বর্তমান মন্ত্রিসভা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করবে।




