খুলনায় ২২টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে কিশোর গ্যাং, আট মাসে ৫৮ হত্যাকাণ্ড

খুলনা মহানগরী ও জেলাজুড়ে কিশোর অপরাধ এখন বাসিন্দাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরীতে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ২২টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
গ্যাংগুলোর দ্বন্দ্বে নগরীতে জোড়া হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে। মাদক বিক্রির অর্থ ভাগাভাগি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত চলছে। এসব গ্যাংয়ের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও কথিত ‘বড় ভাইদের’ আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন ‘বি-কোম্পানি’, ‘পলাশ গ্রুপ’, ‘নূর আজিম বাহিনী’ ও ‘আশিক বাহিনী’র মতো দলগুলোর নিজস্ব ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এদের অন্তত ১৪টি সক্রিয় পেজ ও আইডির খোঁজ পাওয়া গেছে। অপরাধের আগে বা পরে তারা ফেসবুকে প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়ে স্ট্যাটাস দেয়।
হত্যা, মাদক কারবার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ডাকাতির প্রস্তুতির মতো অপরাধে কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে। পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য, মাদক ব্যবসা ও ছিনতাই থেকে শুরু করে প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মতো অপরাধও করছে ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সী কিশোর-তরুণরা।
নগরীর রেলস্টেশন, ৫ ও ৭ নম্বর ঘাট এলাকা, সোনাডাঙ্গা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল, বিভিন্ন পার্ক, টুটপাড়া বড়খালপাড়, লবণচরা, মোল্লাপাড়া, আহসান আহমেদ রোড, রূপসা সেতু সংলগ্ন এলাকা ও হরিণটানা এলাকায় এসব চক্রের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। বিনা কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হওয়া, নারীদের যৌন হয়রানি ও তুচ্ছ ঘটনায় ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
গত ১৯ আগস্ট লবণচরায় মাদককেন্দ্রিক বিরোধের জেরে দুই তরুণকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় কিশোর অপরাধীদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই খুলনায় অন্তত ৫৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার বড় অংশের পেছনে এই গ্যাংগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিরোধ রয়েছে।
১৯ আগস্ট লবণচরা থানার হরিণটানার আশিবিঘা এলাকায় মো. মঞ্জুরুল ইসলাম (২৩) ও মো. নাজমুলকে (১৮) গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর র্যাব-৬ টুটপাড়া এলাকার আলামিন হাসান সাইফি ও তার সহযোগীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়ে ২১ আগস্ট গোপালগঞ্জ সদরের মাঝিগাতী রাজার এলাকা থেকে সাইফি ও রাফিকুল ইসলাম রাকিবকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে সাইফি জানায়, নিহত নাজমুল তাদের গ্রুপের সদস্য ছিল এবং নিহত মঞ্জুরুল রফিক গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
অপরাধীদের অধিকাংশের হাতেখড়ি হচ্ছে মাদকের হাত ধরে। ফেন্সিডিল, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও বস্তি এলাকার ছিন্নমূল শিশুরা। মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে তারা প্রথমে ছিনতাই ও চুরি শুরু করে, যা পরে বড় অপরাধে রূপ নেয়। সম্প্রতি রূপসা ও হরিণটানা এলাকায় বিশেষ অভিযানে বেশ কিছু কিশোরকে ধারালো অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ অভিযান চালালে গ্যাং সদস্যরা কিছুদিন আত্মগোপনে থাকে, কিন্তু অভিযান ঝিমিয়ে পড়লেই তারা আবার এলাকায় ফিরে আসে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ও কথিত বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা নথিতে খুলনা মহানগরীর আটটি থানা ও সংলগ্ন উপজেলাগুলোতে সক্রিয় ২২টি অপরাধী দলের নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে রয়েছে বি-কোম্পানি, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, গোল্ডেন বয়েজ, টিপসি বয়েজ, কিং অব রূপসা, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, ডেঞ্জার বয়েজ, টেঙ্কি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, সেভেন স্টার, নাইন্টিন বয়েজ, ব্লাড বয়েজ, ব্ল্যাক ইগল, ডার্ক নাইটস, চিংড়ি পলাশ গ্রুপ, শিপলু ওরফে রকি গ্রুপ ও সিনবাদ গ্রুপ।
বি-কোম্পানি সম্পর্কে পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রনি চৌধুরী ওরফে বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বাধীন এই সিন্ডিকেট মহানগরীসহ রূপসার বাগমারা ও বটিয়াঘাটার জলমাসহ বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ একটি হত্যা মামলায় গ্রেনেড বাবুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত, তবে এর আগেই তিনি জামিনে বের হয়ে পালিয়ে যান বলে সূত্র জানায়। বর্তমানে গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন রনি চৌধুরী, যিনি নগরীর সামশুর রহমান রোডের বাসিন্দা।
আশিক বাহিনী টুটপাড়া, রূপসা, চাঁনমারি ও লবণচরা এলাকায় সক্রিয়। বাহিনীর প্রধান আশিক পলাতক রয়েছেন। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর নৌবাহিনীর অভিযানে আশিকের ভাই সজীবসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সজীবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১১টি মামলা রয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট রূপসা সেতু টোল প্লাজা থেকে ৯ হাজার ৩৫০ পিস ইয়াবাসহ সজীবকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব।
অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খুলনায় কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকদের মুখ বদলে গেছে, তবে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা একই রয়ে গেছে। দলীয় মিছিল-মিটিংয়ে লোকবল বাড়াতে ও আধিপত্য ধরে রাখতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা এসব কিশোরকে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত কয়েক মাসের বিশেষ অভিযানে পুলিশ ও এসআরবির হাতে বেশ কিছু গ্যাং সদস্য অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। গল্লামারী ও সোনাডাঙ্গা এলাকায় সাহেল নামে এক সদস্যকে সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সোনাডাঙ্গার বসুপাড়া থেকে সাব্বির হাওলাদার ও বাগমারা থেকে আকাশ শেখ গ্রেপ্তার হয়েছে। বটিয়াঘাটার তেঁতুলতলা ১০ নম্বর গেট এলাকা থেকে চাঁদাবাজি ও মানুষকে জিম্মি করার অপরাধে ৬ জন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
সামাজিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল খুলনার পরিচালক শাহ মামুনুর রহমান তুহিন জানান, খুলনা শহরের ২০ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বাস করে। চরম দারিদ্র্য, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ বা পারিবারিক নির্যাতনে অনেক শিশু ঘর ছেড়ে রাস্তায় আশ্রয় নেয়। এদের ঢাল হিসেবে অপরাধে যুক্ত করে গ্যাং লিডার বা স্থানীয় অপরাধী চক্র।




