জাপানের ও-সোজি মডেলে ঢাকার ২১ স্কুলে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ পাইলট প্রকল্প শুরু
জাপানের ‘ও-সোজি’ দর্শনের আলোকে বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও শ্রমের মর্যাদা গড়ে তোলা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে ঢাকায় ‘ক্লিন স্কুল টিম’-এর পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে। উদ্যোগটি নিয়েছেন ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।
প্রাথমিকভাবে ঢাকার ২১টি স্কুলকে এই কর্মসূচির জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্কুলে স্কুলে গঠিত ‘ক্লিন স্কুল টিম’-এর সদস্যদের নিয়েই এই মডেলে স্কুল পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ১১টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিয়া প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উদ্যোগটির উদ্বোধন করেন।
এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, সাপ্তাহিক ডেঙ্গু ঝুঁকি পরিদর্শন, বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং শিক্ষার্থীদের বাসাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা চর্চা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানমের উদ্যোগে নেওয়া এই কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা, দায়িত্ববোধ, শ্রমের মর্যাদা ও পরিবেশ সচেতনতার স্থায়ী অভ্যাস গড়ে তোলা। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদ্যালয় থেকে পরিবার এবং পরিবার থেকে সমাজে পরিচ্ছন্নতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, পরিচ্ছন্নতা শুধু বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখার বিষয় নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, শ্রমের মর্যাদা ও পরিবেশের প্রতি যত্নশীল মনোভাব গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তিনি বলেন, আজকের পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয়ই আগামী দিনের সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ভিত্তি।
বিদ্যালয়ের রুটিন অনুযায়ী প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। শিক্ষার্থীদের ছোট দলে ভাগ করে শ্রেণিকক্ষ, করিডোর ও পাঠাগারের মতো নিরাপদ স্থান পরিষ্কারের দায়িত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষকরা তদারকি করবেন এবং টয়লেট, নোংরা ড্রেন ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরিষ্কার করবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা।
বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিয়া বলেন, ও-সোজি মডেল শুধু পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার একটি কার্যকর উদ্যোগ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা নিজের বিদ্যালয় নিজে পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাস গড়ে তুললে তা তাদের পরিবার ও সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তিনি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলেন এবং এ ক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ জরুরি বলে উল্লেখ করেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক দিন বিদ্যালয়ে ডেঙ্গু ঝুঁকি পরিদর্শন করা হবে। পানি জমার স্থান চিহ্নিত করা, পানির পাত্র ঢেকে রাখা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল অপসারণে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও সমস্যা সমাধানের অগ্রগতি চেকলিস্টে লিপিবদ্ধ করা হবে।
এছাড়া ‘আমার বাসা, আমার দায়িত্ব’ কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা চেকলিস্ট দেওয়া হবে। এতে ঘর গুছিয়ে রাখা, বর্জ্য সঠিকভাবে ফেলা এবং বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়গুলো থাকবে। প্রতি রোববার শিক্ষকরা চেকলিস্ট মূল্যায়ন করবেন।
বিদ্যালয়ে পচনশীল, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও অন্যান্য বর্জ্য আলাদা করে ফেলার ব্যবস্থা করা হবে। ডাস্টবিন ব্যবহারের পাশাপাশি পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির বিষয়েও শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া হবে।
পরিচ্ছন্নতা, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হবে। সেরা বিদ্যালয়, শ্রেণি ও শিক্ষার্থীদের সনদ, বই, শিক্ষা উপকরণ বা গাছের চারা দিয়ে পুরস্কৃত করার প্রস্তাব রয়েছে।
এর আগে গত ৮ জুলাই শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়া ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজধানীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ গঠন করে ঢাকা জেলা প্রশাসন। টিম গঠনের পর প্রায় তিন মাস গবেষণা, বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী জাপানি স্কুল পরিচ্ছন্নতার মডেল ও-সোজির আদলে বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।


