‘ফেরিটিন ফেস’ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দাবির ঝড়: চেহারা দেখে আয়রনের ঘাটতি ধরা যায় না, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

চোখের নিচে কালো দাগ, ধূসর বা ফ্যাকাশে ত্বক, ফাটা ঠোঁট আর চুল পড়া—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে ইনফ্লুয়েন্সাররা এসব লক্ষণের নাম দিয়েছেন ‘ফেরিটিন ফেস’। তাঁদের দাবি, এগুলো শরীরে আয়রনের মজুত কমে যাওয়ার লক্ষণ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চেহারা দেখে আয়রনের ঘাটতি নির্ণয় করা যায় না; এসব লক্ষণের পেছনে অন্য অনেক কারণও থাকতে পারে।
আয়রন শরীরে তৈরি হয় না, এটি আসে খাবার থেকে। ফেরিটিন হলো সেই প্রোটিন, যা শরীরে—বিশেষ করে যকৃতে—আয়রন জমা রাখে এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে ছেড়ে দেয়। রক্ত পরীক্ষায় ফেরিটিনের মাত্রা মেপে শরীরের আয়রনের মজুত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই মাত্রা সব সময় নির্ভরযোগ্য নির্দেশক নয়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সিলেন্সের নির্দেশিকা অনুযায়ী, রক্তে ফেরিটিনের মাত্রা লিটারপ্রতি ৩০ মাইক্রোগ্রামের কম হলে তা আয়রনের ঘাটতি নির্দেশ করে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি হসপিটালসের চিকিৎসা রক্তরোগবিদ্যার অধ্যাপক সু প্যাভর্ড বলেছেন, মাত্রা ৫০-এর নিচে হলেও তা আয়রনের ঘাটতির ইঙ্গিত হতে পারে।
ইনফ্লুয়েন্সারদের বলা লক্ষণগুলো—চোখের নিচে কালো দাগ, ধূসর ত্বক, ফাটা ঠোঁট ও চুল পড়া—জিনগত কারণ, মানসিক চাপ ও পানিশূন্যতাসহ নানা কারণে হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আয়রনের মজুত কমে গেলে শরীরে তার প্রভাব পড়ে। প্যাভর্ডের ভাষায়, “শরীরের প্রতিটি কোষের জন্য আয়রন প্রয়োজন। তাই আয়রনের ঘাটতি হলে আপনি খুব ক্লান্ত থাকবেন, মস্তিষ্ক ঝাপসা লাগবে, ত্বক নিষ্প্রভ ও ঢিলে দেখাবে, ফ্যাকাশে ও ক্লান্ত লাগবে।”
প্যাভর্ড বলেছেন, “আমরা চেহারা থেকে আয়রনের ঘাটতি নির্ণয় করতে পারি না, তবে এটি ঘাটতি থাকতে পারে—এমন একটি ইঙ্গিত হতে পারে।” ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন ও দ্য আয়রন ক্লিনিকের অধ্যাপক টবি রিচার্ডস বলেছেন, আয়রনের মজুত খুব কমে যাওয়া রোগীদের মধ্যে এমন পরিবর্তন বিশেষভাবে প্রকট হয়; তাঁর ভাষায়, “তাঁরা সত্যিই অসুস্থ রোগী হয়ে থাকেন।”
ঘাটতির কারণ সম্পর্কে প্যাভর্ড বলেছেন, “ঋতুস্রাব ও গর্ভাবস্থা সবচেয়ে সাধারণ কারণ।” অন্য কারণের মধ্যে আছে খাবার থেকে পর্যাপ্ত আয়রন না পাওয়া—খাদ্যাভ্যাসের কারণে কিংবা সিলিয়াক রোগের মতো সমস্যায় শোষণ কমে যাওয়ার কারণে। গ্যাস্ট্রাইটিস বা পলিপের মতো পাকস্থলী-অন্ত্রের সমস্যায় রক্তক্ষরণ থেকেও ফেরিটিনের মাত্রা কমতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, “খেলোয়াড়দের মধ্যেও আমরা এটি দেখি, কারণ তাঁদের শরীরে আয়রনের চাহিদা বেশি।”
রিচার্ডস বলেছেন, যাঁদের ফেরিটিন কমার ঝুঁকি বেশি—যেমন বেশি ঋতুস্রাব হয় এমন নারী, গর্ভবতী বা সন্তান জন্ম দিয়েছেন এমন নারী, কিংবা নিরামিষভোজী—তাঁদের রক্ত পরীক্ষা করতে বলা উচিত। সেই পরীক্ষায় পূর্ণ রক্ত গণনা (ফুল ব্লাড কাউন্ট), ফেরিটিনের মাত্রা এবং বি১২ ও ফোলেটের মাত্রা থাকা উচিত। তাঁর ভাষায়, “এটি একটি প্রকৃত রোগ, এবং পরিপ্রেক্ষিতে বলতে গেলে এটি প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের অক্ষমতার প্রধান কারণ।”
প্যাভর্ড বলেছেন, ফেরিটিনের মাত্রা নিয়ে উদ্বিগ্নদের রক্ত পরীক্ষা করতে বলা উচিত এবং ঘাটতির কারণ বোঝা জরুরি। বয়স্কদের ক্ষেত্রে অন্ত্র থেকে রক্তক্ষরণের উৎস খুঁজতে যথাযথ ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন ও তদন্ত প্রয়োজন হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
চিকিৎসা সম্পর্কে প্যাভর্ড বলেছেন, ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই আয়রন ট্যাবলেট কেনা যায়। তাঁর মতে, আয়রনের ঘাটতি নিশ্চিত না করে ট্যাবলেট খাওয়া “আসলে তেমন ক্ষতি করবে না, বিশেষ করে আপনি যদি অল্পবয়সী নারী হন, কারণ ঋতুস্রাবের সঙ্গে আপনার অনেক আয়রন বেরিয়ে যায়।” তবে রিচার্ডস সতর্ক করেছেন, বাজারের অনেক পণ্যে উপযুক্ত মাত্রা থাকে না। তাঁর ভাষায়, ঘাটতি থাকলে পূর্ণ চিকিৎসা-মাত্রায় ওষুধ খেতে হবে এবং তিন মাস পর আবার রক্ত পরীক্ষা করতে হবে; বাজারে যা বিক্রি হয়, তা সাধারণত কম মাত্রার সম্পূরক।
সচেতনতা বাড়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন প্যাভর্ড। তিনি বলেছেন, “আয়রনের ঘাটতিকে স্বাভাবিক মনে করা বন্ধ করতে হবে। অনেক নারী ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা, ছোট বাচ্চা ও ব্যস্ত চাকরি সামলে শুধু ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন, এবং ক্লান্তিকে স্বাভাবিক মনে করা বন্ধ করতে হবে।” রিচার্ডসও একমত: “এই ক্ষেত্রে নারীদের দুর্দশা তুলে ধরা যেকোনো কিছুই ভালো।”
তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দ্য হেলথ স্যুটের চিকিৎসক ডা. আসিয়া মাওলা সতর্ক করে বলেছেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রেন্ডের ঝুঁকি হলো, মানুষ লক্ষণের তালিকায় নিজেকে দেখে ধরে নিতে পারেন যে তাঁর ঘাটতি আছে, অথচ সেটি আসল কারণ কি না তা যাচাই করেন না।”




