স্পেনে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ৬৮, আহত অন্তত ৮০: বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের বর্ণনায় ভয়াবহ মুহূর্ত

স্পেনের তোলেদো প্রদেশে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৮০ জন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার মধ্যবর্তী রেলপথে একই দিকে চলাচলকারী ট্রেন দুটির মধ্যে সংঘর্ষ হয় বলে জানিয়েছে রেল পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তোলেদো প্রদেশের লস ইয়েবেনেস ও উর্দা শহরের মধ্যবর্তী এলাকায় সংঘর্ষের পর ট্রেন দুটির দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে বাঁধের নিচে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলটি আঙুরক্ষেত ও জলপাই বাগানের মাঝে, কাস্তিয়া-লা মানচা অঞ্চলের ছোট শহর উর্দার কাছে।
দুর্ঘটনার শিকার ট্রেন দুটির একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রেনফে এভিই ট্রেন, যাতে ১৪৭ জন যাত্রী ছিলেন। অন্যটি ইতালীয় প্রতিষ্ঠান ইরিওর ট্রেন, যাতে যাত্রী ছিলেন ৩৯৭ জন। পর্যটক ও নিয়মিত যাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় মাদ্রিদ-সেভিয়া রুটে চলাচল করছিল ট্রেন দুটি। রেনফে এভিই ট্রেনটি সকাল ৮টায় মাদ্রিদ থেকে ছেড়ে দক্ষিণে সেভিয়ার দিকে যাচ্ছিল; ইরিও ট্রেনটিও একই দিকে যাচ্ছিল।
প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেনফে ট্রেনটি ইরিও ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দিলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ইরিও ট্রেনের দুটি বগি লাইনচ্যুত হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি ট্রেনের বগিগুলো ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে গেছে, আর অন্য ট্রেনটি রেললাইনের ওপরই রয়েছে। এ সময় জরুরি বিভাগের কর্মীদের দুর্ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণ করতে দেখা যায়। যাত্রীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বগি থেকে ধোঁয়া ওঠার ভিডিও প্রকাশ করেছেন; বগিটি এক পাশে কাত হয়ে পড়ে ছিল।
এবিসি ও এল পাইসকে সূত্র জানিয়েছে, সংকেতব্যবস্থার ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূল সংকেতব্যবস্থার একটি ত্রুটি মেরামতের কাজে নিয়োজিত এক কর্মী সামনে ইরিও ট্রেন থাকার বিষয়ে রেনফে ট্রেনটিকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এটি প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে করা দাবি।
বেঁচে যাওয়া যাত্রী হোসিমার মেদিনা বুধবার সকাল ৯টার কিছু আগে ঘুম থেকে জেগে নিজেকে বাতাসে ভাসতে দেখেন; মাদ্রিদ থেকে সেভিয়াগামী দ্রুতগতির ট্রেনের বগিজুড়ে তিনি ছিটকে পড়ছিলেন। ৩৭ বছর বয়সী এই পেরুভিয়ান পর্যটক এসেছেন উত্তর পেরুর শহর চিকলাইয়ো থেকে। তিনি বলেন, ‘আমি বাতাসে উড়তে থাকার কথা মনে করতে পারি, আর খুঁজছিলাম আমার বান্ধবীকে, সেও বাতাসে ছিটকে যাচ্ছিল।’
নিচে পড়ার পর চারপাশে তাকিয়ে মেদিনা বুঝতে পারেন, তিনি ও তাঁর বান্ধবী ভিতোরিয়া মাইয়া কতটা ভাগ্যবান। তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি কাটাছেঁড়া মানুষ, রক্তে ঢাকা মানুষ, অঙ্গহীন মানুষ, আর একজনকে দেখেছি যার বুকের নিচ থেকে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। আমি দেখেছি মাথা থেঁতলে যাওয়া মানুষ আর বিকৃত হাতের মানুষ।’ রেনফে ট্রেনের সপ্তম বগিতে ছিলেন এই জুটি; আরেকটু সামনের বগিতে থাকলে তাঁরাও দুর্ঘটনার নিহতদের মধ্যে থাকতে পারতেন। বগি থেকে বেরিয়ে চিকিৎসক ও গার্দিয়া সিভিল কর্মকর্তাদের পৌঁছানোর অপেক্ষায় আহতদের সাহায্য করেন তাঁরা। মেদিনার হালকা বাদামি টি-শার্টে লেগে ছিল এক তরুণ আমেরিকান ব্যক্তির রক্ত, যাঁকে নিরাপদ স্থানে সরাতে তিনি সাহায্য করেছিলেন।
সংঘর্ষের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উর্দা পরিণত হয় জরুরি তৎপরতার কেন্দ্রে। স্থানীয় একটি ক্রীড়াকেন্দ্রকে হেঁটে চলতে সক্ষম আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কাস্তিয়া-লা মানচা ও প্রতিবেশী মাদ্রিদের জরুরি সেবার গাড়ি, ভ্যান ও ট্রাকে ভরে যায় শহরের রাস্তা। হালকা আহতদের বাসে করে উর্দায় নিয়ে আসা হয়।
ইরিও ট্রেনে ছিলেন ফিলিপাইনের দম্পতি ফ্রেডরিখ ও আরাবেলা বারিলিয়া, যাঁরা এখন দুবাইয়ে থাকেন। ধাক্কায় ফ্রেডরিখ ছিটকে পড়েন। তিনি বলেন, ‘একজন চিৎকার করছিল, বেরিয়ে যাও! বেরিয়ে যাও! আরেকটি ট্রেন ধাক্কা দিতে পারে!’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখলাম সবাই নেমে যাচ্ছে। অনেকের মাথায় আঘাত, রক্তে ঢাকা। আমরা যতটা সম্ভব ট্রেন থেকে দূরে সরে গেলাম।’ আরাবেলা বলেন, ‘সবকিছু ঘটে গেছে এক মুহূর্তের মধ্যে। আমরা যে টেবিলে বসেছিলাম, সংঘর্ষে তা হারিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আমরা দ্বিতীয় জীবন পেয়েছি। কখন কী ঘটতে পারে, কেউ জানে না। আমরা খুবই কৃতজ্ঞ।’
তুরস্কের তরুণ পর্যটক আতা ইয়েলকায়া সাধারণত বাসে করে স্পেন ভ্রমণ করেন; বুধবার তিনি ইরিও ট্রেনে চড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ঘুমঘুম অবস্থায়, ট্রেনটি কোনো স্টেশনে থেমেছে ভেবে তিনি ট্যাবলেট বন্ধ করে হুড টেনে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সকাল ৮টা ৫৩ মিনিটে তিনি সেই ধাক্কা অনুভব করেন, যা ছিল তাঁর পেছনের বগিগুলোতে রেনফে ট্রেনের আঘাত। তিনি বলেন, ‘আমি ধাক্কা খেয়ে জেগে উঠি এবং সামনের আসনে মাথায় আঘাত পাই। পাশে তাকিয়ে দেখি কাছের এক বয়স্ক দম্পতির নারীর ভ্রুতে কাটা দাগ। তখনই বুঝলাম, গুরুতর কিছু ঘটেছে।’ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তিনি দেখেন, তাঁর ৫ নম্বর বগির পেছনের বগিগুলো লাইনচ্যুত হয়ে গেছে এবং অনেক মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন। ২০২৩ সালে তুরস্কের ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা থাকা ইয়েলকায়া বলেন, তিনি শান্ত থেকে অন্যদের ট্রেন থেকে নামতে সাহায্য করার চেষ্টা করেন; বাইরে বেরিয়ে মৃতদের দেখার পরই ঘটনার ভয়াবহতা তাঁকে আঘাত করে।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ উর্দা সফরে বলেছেন, স্পেন শোকে মুহ্যমান। তবে দশ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে স্পেনের দ্বিতীয় প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া অনেকেই তখনো শোক শুরু করার মতো অবস্থায় ছিলেন না। জানুয়ারিতে আদামুজ রেল দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন; দুটি দুর্ঘটনায় দশ মাসের ব্যবধানে অন্তত ১১৪ জনের প্রাণ গেছে। আত্মীয়দের খোঁজে আসা মানুষদের জন্য স্থাপিত একটি হলঘরে স্থানীয়রা খাবার ও পানি পৌঁছে দিয়েছেন, যেমনটি আদামুজের ঘটনার সময়ও দেখা গিয়েছিল।
তবে আদামুজের ঘটনার মতোই, এই সংহতি ও সদয় আচরণের পর আগামী ঘণ্টাগুলোতে ক্ষোভে রূপ নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে — ইউরোপের সবচেয়ে আধুনিক ও বিস্তৃত দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কগুলোর একটিতে কীভাবে এমন দুটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন মানুষ। স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী দুর্ঘটনার পেছনের পরিস্থিতিকে ‘ব্যাখ্যাতীত’ বলে অভিহিত করেছেন; সেই ব্যাখ্যা যত দ্রুত ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সম্ভব দিতে হবে।




