ইসরায়েলের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েও সরকার গঠনে বেকায়দায় নেতানিয়াহুর জোট

ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েও সরকার গঠনের পথে বেকায়দায় পড়েছে। বুধবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকালে প্রায় ৫০ লাখ ভোট গণনার পর দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।
সরকার গঠনের জন্য নেসেটে প্রয়োজন ৬১ আসন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোটের আসন দাঁড়াচ্ছে ৫৩টিতে — সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আটটি কম।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেতে পারে ২৬টি আসন। ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, শাস ও ওতজমা ইয়েহুদিত পেতে পারে সাতটি করে এবং রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট পার্টি পেতে পারে ছয়টি আসন। সব মিলিয়ে জোটের আসনসংখ্যা ৫৩।
অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৪৮টি আসন। এই জোটে রয়েছে ইয়াশার, জোট টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু ও ডেমোক্র্যাটস।
বিরোধী শিবিরের দলগুলোর মধ্যে আইজেনকটের ইয়াশার পেতে যাচ্ছে ২১টি আসন। নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের নেতৃত্বাধীন জোট টুগেদার পেতে পারে ১২টি, ইয়াইর গোলানের ডেমোক্র্যাটস আটটি এবং আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু সাতটি আসন।
এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯টিতে। এর মধ্যে জয়েন্ট লিস্ট পেতে পারে ১২টি এবং রা’আম সাতটি আসন। এই ফল বহাল থাকলে প্রধান দুই জোটের মধ্যে কারা সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারণে আরব দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে সর্বশেষ ফলাফলে ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের মধ্যে ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা আপাতত কম। আইজেনকট নেতানিয়াহুর অধীনে সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন; এমনকি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবের ভিত্তিতে গঠিত সরকারেও তিনি নেতানিয়াহুর অধীনে কাজ করতে রাজি নন। বিরোধী জোটের অন্য নেতারাও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
আইজেনকট বিরোধী জোটের সবচেয়ে বড় দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী পদের প্রার্থী করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে জোটের মধ্যে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি।
সর্বশেষ ফলাফল ও বুথফেরত জরিপের হিসাব এমন একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনাও সামনে এনেছে, যা নেসেটে আস্থা ভোটে জয়ী হতে পারে, কিন্তু যার হাতে ৬১ আসনের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে না। তবে আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করার বিষয়ে বিরোধী জোটের ভেতরে আপত্তি থাকায় এমন সরকার গঠনও জটিল হতে পারে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অচলাবস্থা নতুন নির্বাচনের দিকেও নিয়ে যেতে পারে, যদিও তার আগে জোট গঠনের আলোচনায় দলগুলোর সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
এদিকে ডেমোক্র্যাটসের চেয়ারম্যান ইয়াইর গোলান বলেছেন, ২০২৬ সালের নেসেট নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট হেরে গেছে। আরব দলগুলোকে বিরোধী জোটের সঙ্গে ধরলে তাদের আসনসংখ্যা ৬৫-তে দাঁড়ায় বলে দাবি করেন তিনি। বুধবার সকালে তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু হেরেছেন। আমি ১২০ পর্যন্ত গুনতে জানি। ৬৫ হলো ৫৫-এর চেয়ে বেশি। ইসরায়েলি গণতন্ত্র এভাবেই কাজ করে।’
গোলান আসন্ন সরকারে আরব দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নেতানিয়াহু যদি জায়োনিস্ট জোট গঠনের কথা বিবেচনা করেন, তাহলে তাঁর নিজের জোট থেকে নন-জায়োনিস্ট হেরেদি দলগুলোর ১৬ জন সংসদ সদস্যকে বাদ দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। আমাদের দায়িত্ব আছে। আর ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিবর্তনের সরকার গঠনের সুযোগও আছে — এমন একটি সরকার, যা সব ইসরায়েলি নাগরিকের জন্য কাজ করবে।’
জয়েন্ট লিস্টের চেয়ারম্যান ইউসেফ জাবারিনও নেতানিয়াহু সরকারকে সরিয়ে দিতে বিরোধীদের সহযোগিতা করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘রক্তপাত, আধিপত্যবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বিকল্প একটি প্রস্তাব করছি। পরিবর্তন আসতে পারে ইহুদি-আরব অংশীদারত্বের মাধ্যমে।’
পরে আর্মি রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জয়েন্ট লিস্টের সংসদীয় দলের চেয়ারম্যান ও হাদাশ-তা’আল নেতা আহমাদ তিবিও বিরোধীদের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, বিরোধী জোট সাহস দেখালে সরকার গঠন করতে পারবে এবং আরব দলগুলো সহযোগিতার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডানপন্থি সরকার গঠনে জোর দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, ইসরায়েলের অস্তিত্বের বিরোধী আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন করে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ক্ষমতায় টিকে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে সর্বশেষ ফলাফলে দেখা যাচ্ছে।




