দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার, দক্ষতার ঘাটতিই বড় কারণ

দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই চাকরি মেলে না — অনেকেরই প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক জ্ঞান ও কারিগরি দক্ষতা নেই। গবেষণায় বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশই বেকার।
উচ্চশিক্ষিত বেকারদের বড় অংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। একদিকে সনদধারীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধানও বাড়ছে।
বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১৭২টি। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি এবং বেসরকারি ১১৬টি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ আছে ২ হাজার ২৫৭টি, যার মধ্যে সরকারি কলেজ ৫৫৫টি। এসব তথ্য ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২৩ অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে।
অনেক শিক্ষার্থী অনার্স-মাস্টার্সে পড়েও বাংলা-ইংরেজি শুদ্ধভাবে বলতে বা পড়তে পারেন না বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। নিজের বক্তব্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার মতো মৌলিক দক্ষতায়ও অনেকে পিছিয়ে রয়েছেন।
গ্রামগঞ্জের অনেক বেসরকারি কলেজে যোগ্য শিক্ষক, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থা ছাড়াই অনার্স ও ডিগ্রি পাস কোর্স খোলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের অনেক সরকারি কলেজের অবস্থাও একই — ক্লাস ঠিকমতো হয় না বলেও বলা হয়েছে।
চাকরিদাতারা এখন এমন কর্মী খোঁজেন, যাঁদের বাস্তব সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর যোগাযোগের সক্ষমতা রয়েছে। একজন শিল্পপতির বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিনি চাকরি দেওয়ার জন্য সাক্ষাৎকার নিতে গেলে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পান না।
এই সংকট কাটাতে তাত্ত্বিক পড়াশোনা ও পরীক্ষায় পাসের ওপর শুধু গুরুত্ব না দিয়ে প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং হাতে-কলমে কাজ শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির কথাও বলা হয়েছে। এ জন্য দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়নের প্রসার এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রস্তাব হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কাঠামো পুনর্গঠন করে ‘জাতীয় বৃত্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হবে শুধু সনদ দেওয়া নয়, বরং অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা।
প্রস্তাবিত কাঠামোর অধীনে অঞ্চলভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্রে কৃষি ও কৃষিপ্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, মার্কেটিং, ব্যবসায় ও হিসাবরক্ষণ, পর্যটন, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পেশায় ডিপ্লোমা, স্নাতক ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিটি কোর্সে হাতে-কলমে শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ ও বাস্তব প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনের অর্থ সাধারণ উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ করা নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও বিজ্ঞানসহ মৌলিক জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব থাকবে এবং যোগ্য শিক্ষক ও অবকাঠামোসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
আলোচনায় বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য বিশাল ক্যাম্পাস বা শিক্ষার্থীর সংখ্যায় নয় — তা নির্ভর করে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সক্ষমতার ওপর। শিক্ষার সার্থকতা সনদে নয়, অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারার মধ্যে।




