উপসাগরীয় দেশগুলোকে ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা নতুন করে সাজাতে হবে: আইআইএসএসের প্রতিবেদন

উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে সাজাতে হবে বলে মন্তব্য করেছে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)। সংস্থাটির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি হামলায় এসব দেশের অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলো আদৌ কতটা সুরক্ষা দিতে পারছে, সেই প্রশ্নের মুখে পুরোনো প্রতিরক্ষা ধারণা আর চলবে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির আগের কয়েক সপ্তাহে উপসাগরকেন্দ্রিক ১২টি আঞ্চলিক দেশের দিকে ইরান ৪ হাজার ৬৭০টি একমুখী হামলাকারী ড্রোন এবং ১ হাজার ৪০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। এসব হামলার প্রায় অর্ধেকেরই লক্ষ্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলাগুলোর বেশির ভাগই প্রতিহত করা হয়েছিল। তবু জ্বালানি অবকাঠামোতে ক্ষতির একটি হিসাব প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করা হয়েছে, যার পরিমাণ ৫৮ বিলিয়ন ডলার (৪৩ বিলিয়ন পাউন্ড) পর্যন্ত হতে পারে।
প্রতিবেদনে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একটি ‘অস্বস্তিকর সত্য’ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে কেনা মার্কিন অস্ত্র সংকটের মুহূর্তে মার্কিন সুরক্ষায় রূপ নেয়নি; পাশাপাশি এসব দেশের সামরিক বাহিনী নতুন ধরনের ক্ষয়িষ্ণু আকাশযুদ্ধের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতও নয়।
প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন সরবরাহ করা আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গোলাবারুদের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা, আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সমন্বয় গড়ে তুলতে ব্যর্থতা, মাইন অপসারণের সক্ষমতার ঘাটতি, পাল্টা হামলার সীমিত সুযোগ।
আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে খরচের অসামঞ্জস্য। তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যয়বহুল, উচ্চপ্রযুক্তির ব্যবস্থা ব্যবহার করতে গিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিষেধাজ্ঞামূলক পর্যায়ের খরচ বইতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিভক্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর ইরানের সঙ্গে নতুন অনাক্রমণ চুক্তির পথে যাওয়া উচিত কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনটি নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে। তবে এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অংশীদারত্ব ইরানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষায়, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব বরং ইরানকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার আরেকটি অজুহাত জুগিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উপসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে জনমতও বদলে যাচ্ছে — ‘নিরাপত্তা প্রদানকারী’ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেকের চোখে ‘কৌশলগত বোঝা’ হয়ে উঠছে।
আইআইএসএসের মতে, অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী কমানো বা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হলে ইরান সেটিকে নিজের ‘কৌশলগত সাফল্য’ ও দৃঢ়তার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরবে। একই সঙ্গে দশকের পর দশক ধরে মার্কিন সুরক্ষা চাওয়ার জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে লজ্জা দেওয়ার কাজেও তেহরান এই বিষয়টি ব্যবহার করবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির সদস্য ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেছেন, উপসাগরে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটিগুলো পুনর্নির্মাণ করা আদৌ যুক্তিসঙ্গত কি না, তা নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিতর্ক চলছে। মারফির ভাষায়, উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতৃত্ব চায় যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটিগুলো পুনর্নির্মাণ করুক এবং অঞ্চলে উপস্থিতি বজায় রাখুক।
মারফি প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘গরম যুদ্ধ শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুছে যাওয়া একটি ঘাঁটি অঞ্চলে রেখে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় কী লাভ?’ তিনি আরও বলেন, ‘পরের যুদ্ধ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উড়ে যাওয়া ঘাঁটি পুনর্নির্মাণ করলে আমরা করদাতাদের অর্থের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে অপরাধমূলক অযোগ্যতার পরিচয় দেব।’
মারফির মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তত অঞ্চলে ছোট আকারের উপস্থিতি রাখতে হবে এবং সেই উপস্থিতি পুনর্গঠনের সীমারেখা হবে ‘আমরা কী রক্ষা করতে পারি’ — কারণ বর্তমান পরিসরের উপস্থিতি রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়, আর রক্ষা করা না গেলে তা অকার্যকর। তিনি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে দূরে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলো আরও দূরে সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন।




