মাদক মামলার প্রায় ৯৫ শতাংশই ঝুলে আছে: বিচারের অপেক্ষায় ৪ লাখ ৩ হাজার ৯০৮ মামলা
দেশের বিচারিক আদালতগুলোতে মাদক মামলার নজিরবিহীন জট তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত ত্রৈমাসিক মেয়াদে বিচারিক আদালতে মোট মাদক মামলা ছিল ৪ লাখ ২৬ হাজার ১১০টি; এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার ২০০টি, অর্থাৎ ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। বর্তমানে চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় ঝুলে আছে ৪ লাখ ৩ হাজার ৯০৮টি মামলা, যা মোট মামলার প্রায় ৯৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ — প্রায় ৯৫ শতাংশ।
পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ওই মেয়াদে আগের মেয়াদের জের হিসেবে স্থানান্তরিত হয়ে আসা মামলা ছিল ৪ লাখ ৬ হাজার ১৪৭টি। নতুন করে দায়ের হয় ১ হাজার ১৭৬টি মামলা এবং অন্যান্য উৎস থেকে আসে আরও ১৮ হাজার ৭৮৭টি। ৬ হাজার ২টি মামলা বিচারিক প্রয়োজনে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে জট সবচেয়ে বেশি ঢাকা ও চট্টগ্রামে। ঢাকা বিভাগে মোট ১ লাখ ২০ হাজার ২২৬টি মামলার বিপরীতে বিচারাধীন আছে ১ লাখ ১২ হাজার ৫৫৭টি; নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ হাজার ২০০টি। চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৯ হাজার ১১৪টি মামলার মধ্যে অমীমাংসিত ৯৬ হাজার ৫৭০টি, নিষ্পত্তি মাত্র ২ হাজার ৩৩১টি।
এরপর রাজশাহী বিভাগে ৮৭ হাজার ৬৩৯টি, খুলনা বিভাগে ৪৫ হাজার ৮০১টি এবং রংপুর বিভাগে ৪৩ হাজার ৯৯টি মামলা ঝুলে আছে। সবচেয়ে কম চাপ সিলেট বিভাগে — সেখানে মোট ১০ হাজার ৪৬১টি মামলার মধ্যে বিচারাধীন ৯ হাজার ৮৬১টি।
একক বিচারিক এলাকা হিসেবে সর্বোচ্চ মামলা ঢাকা ট্রাইব্যুনালে: মোট ৪৩ হাজার ৭৬২টির মধ্যে ৪০ হাজার ৪৩১টিই অমীমাংসিত। চট্টগ্রাম ট্রাইব্যুনালে ৪০ হাজার ৬৭৮টির মধ্যে ঝুলছে ৩৯ হাজার ৬৯০টি এবং রাজশাহী ট্রাইব্যুনালে ২৬ হাজার ৭৭৩টির মধ্যে বিচারাধীন ২৬ হাজার ৫৯টি। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে ১৯ হাজার ১২৭টি, কক্সবাজারে ১৭ হাজার ৫১২টি এবং বগুড়ায় ১৪ হাজার ৮৯৫টি মামলা আটকে রয়েছে।
দীর্ঘসূত্রতার চিত্র আরও উদ্বেগজনক: সারা দেশে ৮৫ হাজার ৯১১টি মাদক মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি, যা মোট মামলার প্রায় ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগে এমন মামলা ২৯ হাজার ১৩০টি; ঢাকা ট্রাইব্যুনালে ১৯ হাজার ৫২৩টি, কক্সবাজারে ১২ হাজার ৭৪৪টি এবং চট্টগ্রাম ট্রাইব্যুনালে ১০ হাজার ২৬টি মামলা পাঁচ বছর পেরিয়েছে।
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে নিম্ন আদালতে আরও ২০৬টি মাদক মামলার বিচার সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৮৯টি, রংপুরে ৩২টি এবং ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে ১১টি করে; শুধু ঢাকা ট্রাইব্যুনালেই স্থগিত আছে ৭৩টি মামলা।
জটের পাশাপাশি সহজে জামিন পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে প্রতিবেদনে। বিদেশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট রাজধানীর গুলশানের মাদানী অ্যাভিনিউ থেকে গ্রেপ্তার হন আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত তরিকুল ইসলাম (৩৭)। তাঁর দেওয়া তথ্যে গ্রিন রোডের বাইতুল লাজ ভবনের চতুর্থ তলা থেকে উদ্ধার হয় প্রায় দেড় লাখ ট্রামাডল বড়ি। অথচ গ্রেপ্তারের ৩১ ঘণ্টার মধ্যে তিনি জামিন পেয়ে যান।
২১ আগস্ট বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারের পর ২৪ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন তরিকুল ও উজ্জ্বল মিয়ার জামিন বাতিল করেন। আদালত বলেন, জামিনের আদেশটি ছিল তড়িঘড়ি করে দেওয়া, পক্ষপাতমূলক ও অন্যায্য এবং ম্যাজিস্ট্রেট ভুলভাবে তা দিয়েছিলেন। পরে নতুন মাদক মামলায় তরিকুল আবার গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং এখন কারাগারে আছেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আইনে কঠোর বিধান থাকলেও এ চিত্র তৈরি হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ফাঁসি। আইনের ৪৬ ধারায় সব মাদক অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য; ৪৭ ধারায় নারী, শিশু বা শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ না হলে আদালত সহজে জামিন দিতে পারবে না; আর ৪৮ ও ৫১ ধারা অনুযায়ী গুরুতর অপরাধের বিচার ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার কথা।
বিলম্বের কারণ হিসেবে আইনজীবীরা বলছেন বিচারক ও সরকারি কৌঁসুলির ঘাটতি এবং সাক্ষী হাজির করতে না পারা। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ. এম. জামিউল হক (ফয়সাল) বলেন, জব্দ তালিকার সাক্ষী অনেক সময় পথচারী হন, যাঁদের পরে আদালতে আনা সম্ভব হয় না, আর একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিতেই দুই থেকে তিন ঘণ্টা লেগে যায়। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, সাক্ষী সময়মতো আসে না, চার্জ শুনানিতে আসামিপক্ষ ও সরকারি কৌঁসুলি সময় নেন, বিচারক চাইলেই চার্জ গঠন করতে পারেন না।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, আসামিদের সাজা নিশ্চিত করা জরুরি; সে লক্ষ্যে অধিদপ্তর নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট তৈরি করেছে, সরকার ট্রাইব্যুনাল করেছে এবং এফআইআর, চার্জশিট ও জব্দ তালিকা যথাযথভাবে তৈরির জন্য তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রতিদিন শতাধিক আসামি গ্রেপ্তার হলেও অনেকে জামিনে বেরিয়ে আবার কারবারে জড়াচ্ছেন, কেউ কেউ জামিননামার কপি পৌঁছানোর আগেই লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছেন।




