ঠাকুরগাঁওয়ে শোকজের পরও বিএনপি প্রার্থীর প্রচারে শিক্ষক: বিভাগীয় মামলার নির্দেশ নির্বাচন কমিশনের

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ঠাকুরগাঁওয়ের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অভিযুক্ত শিক্ষক জুলফিকার রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করে দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি গৃহীত ব্যবস্থা কমিশনকে জানাতে বলা হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিটি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। এতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জুলফিকার রহমান ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া উপজেলার আরাজী দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি সেনুয়া ইউনিয়নের চামেশ্বরী চৌধুরীহাট এলাকার মৃত সোলেমান মাস্টারের ছেলে।
নির্বাচন কমিশনের চিঠি অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালানোর পাশাপাশি সেনুয়া ইউনিয়নে প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন করেন জুলফিকার রহমান। বিভিন্ন নির্বাচনী কর্মসূচিতেও বক্তব্য দেন তিনি। এসব কর্মসূচির ভিডিও ধারণ করে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন। নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির তদন্তেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ এবং প্রাসঙ্গিক নির্বাচনী আইন অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া কিংবা কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালানোর সুযোগ নেই। তা সত্ত্বেও জুলফিকার রহমান প্রকাশ্যে একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার ও সমর্থন জানিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গত ১৩ অক্টোবর জুলফিকার রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। জামায়াতে ইসলামীর ঠাকুরগাঁও পৌর যুব বিভাগের সভাপতি রাজিউর রহমানের অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছিল।
পরে ১৯ অক্টোবর কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পীরগঞ্জ জজ আদালতের সিভিল জজ তোসিকুল আলমের আদালতে লিখিত জবাব জমা দেন ওই শিক্ষক। নিজের কর্মকাণ্ডকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে উল্লেখ করে ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার অঙ্গীকার করেন তিনি। পাশাপাশি অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদনও জানান।
তবে জবাব দেওয়ার পরও তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি বক্তব্য নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। সেখানে তিনি লেখেন, জুলফিকারকে এভাবে থামানো যায় না — দ্বিগুণ বেগে, ঝড়ের গতিতে চলমান যুদ্ধের প্রান্তরে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ জ্বলে উঠবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির আদেশে বলা হয়, জুলফিকার রহমানের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তার তথ্য পাওয়া গেছে। ‘উপনির্বাচন ঠাকুরগাঁও-১, মির্জা ফয়সল আমিনকে ধানের শীষে ভোট দিন’ ক্যাপশনে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছিল।
আদেশে উল্লেখ করা হয়, ওই আসনে প্রতীক বরাদ্দের তারিখ ছিল ৮ অক্টোবর। ফলে প্রতীক বরাদ্দের আগেই একজন প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালানোর অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর ২১(ক), ২১(খ) ও ১৮ বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, গত বুধবার নির্বাচন কমিশনের চিঠি হাতে পেয়েছেন তাঁরা। এতে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী কার্যক্রমের ব্যস্ততার কারণে চিঠিটি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পরে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে জুলফিকার রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর জানা মতে, ওই নোটিশের জবাবও দিয়েছেন শিক্ষক। তবে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশসংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের চিঠি তিনি এখনও পাননি, বিষয়টি তিনি শুনেছেন বলে জানান। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জুলফিকার রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।



