জীবনযাত্রার খরচ, এআই আর ইরান যুদ্ধ: মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কী ভাবছেন মার্কিন ভোটাররা

যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট হবে। এই ভোটে নির্ধারিত হবে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের ভবিষ্যৎ, সেই সঙ্গে ৩৬টি রাজ্যের গভর্নর পদ। ভোটের আগে গার্ডিয়ানের পাঠক ভোটাররা জীবনযাত্রার খরচ, অভিবাসন, জলবায়ু সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বড় প্রযুক্তি কোম্পানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশের যুদ্ধ নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ ও হতাশার কথা জানিয়েছেন।
এই মাসে নেওয়া নিউইয়র্ক টাইমস/সিয়েনা জরিপে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের হার নেমেছে ৩৬ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি ৩.৭ শতাংশে পৌঁছানোয় অনেক ভোটারের কাছে জীবনযাত্রার খরচই প্রধান উদ্বেগ।
নর্থ ক্যারোলাইনার হ্যাটারাস আইল্যান্ডের বাসিন্দা, ডেয়ার কাউন্টি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ক্যাথরিন ওয়ারেন বলেন, তিনি ও তাঁর স্বামী আগাম ভোট দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এই অর্থনীতিতে তাঁরা কোনোমতে টিকে আছেন; প্রত্যন্ত এলাকায় থাকায় জ্বালানির খরচ তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার বড় অংশ খেয়ে ফেলছে, নিত্যপণ্য ও ওষুধের দাম অসহনীয়, আর যে ওষুধ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে তার দাম বীমার আগে মাসে ৭ হাজার ডলার।
টেনেসির ৩৬ বছর বয়সী এক কাউন্সেলর জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে আর্থিক চাপ মিলে তাঁর অবস্থা কঠিন। তাঁর মাইগ্রেনের ওষুধের দাম মাসে প্রায় ২ হাজার ডলার; বীমা কোম্পানি পাঁচ মাসের খরচ দিতে রাজি হয়েছে, তার বেশি নয়। ২৪ বছর ধরে দীর্ঘস্থায়ী মাইগ্রেনে ভুগে তিনি সব চেষ্টা করেছেন, এই ওষুধই প্রথম ব্যথা কমিয়েছে, তাই সস্তা বিকল্পে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
মিশিগানের আলপাইন টাউনশিপের ৬৬ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত বিপণন যোগাযোগ পেশাজীবী ভিকি স্টেইন বলেন, তিনি সব পদে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, শুল্কের কারণে কর্মজীবী আমেরিকানরা স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি ও নিত্যপণ্য কিনতে পারছেন না এবং শিশুরা স্ন্যাপ সুবিধা হারাচ্ছে। তিনি এই গ্রীষ্মে ২৭টি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া দূষিত লেটুস থেকে সাইক্লোস্পোরা প্রাদুর্ভাবের কথাও উল্লেখ করেন।
টেক্সাসের হিউস্টনের ২৩ বছর বয়সী বিজনেস স্কুল স্নাতক জর্জ জীবনযাত্রার সংকটের জন্য প্রশাসনের নীতিকে দায়ী করে ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দুই দলেরই অগ্রাধিকার সাধারণ মানুষের চেয়ে ধনকুবেরদের দিকে বেশি, এবং জেমস ট্যালারিকোর মতো রাজনীতিকদের সাশ্রয় ও জীবনযাত্রার মানের দিকে মনোযোগ দেওয়া উৎসাহব্যঞ্জক।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তার বিরোধিতাও অনেক ভোটারের প্রধান উদ্বেগ। নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কির ৬৬ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী জোয়েল ইয়াং বলেন, ফেডারেল পদের যেকোনো নির্বাচনে তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো প্রার্থী ইসরায়েলকে আর একটি ডলার, অস্ত্র বা উপকরণ দিতে রাজি হবেন কি না।
লুইজিয়ানার বোগালুসার ৩০ বছর বয়সী এক মেশিন অপারেটর ও বাবা ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সমালোচনা করে বলেন, যুদ্ধ চলার প্রতিটি দিন সেনা সদস্য, করদাতা ও দেশকে কলঙ্কিত করছে, শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা ও জাতীয় ঋণের মাধ্যমে সন্তানদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বড় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন ভোটাররা। জর্জিয়ার ৭৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ডেভ নেপস বলেন, এআই আর্থিক বুদ্বুদ তাঁকে নব্বইয়ের দশকের ডটকম ধস ও ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, দুই বারেই তিনি ও তাঁর স্ত্রী অর্থ হারিয়েছিলেন। জর্জিয়ার উত্তরাঞ্চলের ৪৭ বছর বয়সী বীমা নির্বাহী জয় বলেন, তাঁর গ্রামীণ এলাকায় ডেটাসেন্টার বসাতে স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করা হচ্ছে এবং বিশাল কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে; তিনি ডেটাসেন্টারে স্থগিতাদেশ চান।
জলবায়ু সংকট ও পরিবেশ সুরক্ষাও প্রধান উদ্বেগ, বিশেষ করে বয়স্ক ভোটারদের কাছে। ওয়াশিংটনের ৫৭ বছর বয়সী নার্স ডেভিড টাকার বলেন, ইউটায় বড় হওয়ার সময় তিনি পরিবারের সঙ্গে সরকারি বন ও মরুভূমিতে ক্যাম্পিং ও মাছ ধরে সময় কাটিয়েছেন; জলবায়ু সংকট, সরকারি ভূমি রক্ষা, গণতন্ত্র ও স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়ন কাটছাঁট তাঁর প্রধান উদ্বেগ। বোথেলের ৭১ বছর বয়সী কে বলেন, গ্রহের অবক্ষয় তাঁর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, কারণ আমরা একটি বিপজ্জনক সীমার খুব কাছে পৌঁছে গেছি।
অভিবাসন প্রয়োগ ও ভোটকেন্দ্রে ভীতি প্রদর্শনের আশঙ্কাও ভোটারদের উদ্বেগে রয়েছে। কলোরাডোর ডেনভারের ৩৪ বছর বয়সী শিল্পকর্মী কেটি এই বছরের শুরুতে মিনেসোটায় ফেডারেল অভিবাসন এজেন্টদের হাতে দুই আমেরিকান, রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটির নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, তিনি এমন প্রার্থীদের ভোট দিচ্ছেন যারা আইসিইকে অর্থ দেওয়া বন্ধ ও বিচারের আওতায় আনবেন।
কানসাসের গ্রামীণ এলাকার অবসরপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক জুলি স্টিয়েলস্ট্রা আগামী সপ্তাহে ভোটকর্মী হিসেবে কাজ করবেন। তিনি বলেন, তাঁর রাজ্যে সম্প্রতি সক্রিয় আইসিই এবং সশস্ত্র ব্যক্তি বা স্বঘোষিত পোল ওয়াচারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি নিয়ে তিনি শঙ্কিত, যদিও কাউন্টি ক্লার্কের সতর্কতার ওপর তাঁর আস্থা আছে। নর্থ ক্যারোলাইনার লাম্বারটনের ৬৩ বছর বয়সী সমাজকর্মী রিচার্ড করকোরান বলেন, ট্রাম্পের অধীনে ফেডারেল সরকার এই নির্বাচনের ফল মানবে কি না, তা নিয়ে তাঁর আস্থা নেই এবং ভোটের পর সমস্যা হবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।




