মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই: চার আসন পেলেই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে ডেমোক্র্যাটরা
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসনে নিট জয় প্রয়োজন। বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি।
বছরের শুরুতে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট দখল প্রায় অসম্ভব মনে হলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ, ইরান যুদ্ধ এবং মূল্যবৃদ্ধি একসময়ের নিরাপদ রিপাবলিকান রাজ্যগুলোর লড়াইকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।
আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সালিভান পুনর্নির্বাচনে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট সাবেক প্রতিনিধি মেরি পেল্টোলার বিরুদ্ধে। রাজ্যটিতে ‘র্যাংকড-চয়েস’ ভোটিং পদ্ধতিতে ভোটাররা পছন্দের ক্রম অনুযায়ী প্রার্থীদের সাজাতে পারেন। ব্যালটে মোট চারজন প্রার্থী আছেন, যাদের মধ্যে সালিভানের একই নামের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন। রিপাবলিকানদের অভিযোগ, ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে ডেমোক্র্যাটরাই উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওই একই নামের প্রার্থীকে দাঁড় করিয়েছে। ট্রাম্প একে ‘নির্বাচনী জালিয়াতি’ বললেও পেল্টোলা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এসব বিতর্ক আলাস্কাবাসীর মূল উদ্বেগ—জীবনযাত্রার ব্যয়—থেকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা।
আলাস্কায় অক্টোবরে পেল্টোলা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছেন, যেখানে সালিভানের সংগ্রহ প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। তবে প্রচারে রিপাবলিকানরা খরচ করেছে ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার, ডেমোক্র্যাটরা ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ২০২৪ সালে ট্রাম্প আলাস্কায় ১৩ পয়েন্টে জিতলেও সাম্প্রতিক জরিপে পেল্টোলা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।
আইওয়াও সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি; ২০২৪ সালে ট্রাম্প সেখানে ১৩ পয়েন্টে জিতেছিলেন। কিন্তু শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ায় রাজ্যটির কৃষি অর্থনীতি চাপে পড়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর জনি আর্নস্ট পুনর্নির্বাচনে না লড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সেখানে উন্মুক্ত আসনে লড়ছেন রিপাবলিকান প্রতিনিধি অ্যাশলি হিনসন ও ডেমোক্র্যাট রাজ্য প্রতিনিধি জশ টুরেক, যিনি দুবারের প্যারালিম্পিক স্বর্ণপদকজয়ী। হিনসন ইরান যুদ্ধের ‘অবিলম্বে অবসান’ চাইলেও ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা পলিটিফ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, তিনি মার্কিন সম্পৃক্ততা শেষ করার ছয়টি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তহবিল সংগ্রহে টুরেক ২ কোটি ডলার নিয়ে হিনসনের ১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও জরিপে হিনসন সামান্য এগিয়ে।
কানসাস ১৯৩২ সালের পর থেকে সিনেটে কোনো ডেমোক্র্যাটকে নির্বাচিত করেনি; ২০২৪ সালে ট্রাম্প সেখানে ১৬ পয়েন্টে জিতেছিলেন। এবার রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম হ্যামিল্টন, যিনি একটি মেথডিস্ট মেগাচার্চের প্রতিষ্ঠাতা যাজক। ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দুজনেই রাজ্যটিতে প্রচারে অংশ নিয়েছেন। খামারভিত্তিক অর্থনীতির এই রাজ্যে ডিজেল ও সারের দাম বাড়া এবং ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে কৃষকদের হতাশা প্রচারের বড় ইস্যু। দক্ষিণ-পশ্চিম কানসাসে অভিবাসন সংস্থা আইসিইর অভিযান ব্যবসায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে; এমনকি রিপাবলিকান মার্শালও সংস্থাটির কার্যক্রমের কিছু দিকের সমালোচনা করেছেন। তহবিলে হ্যামিল্টন ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার নিয়ে মার্শালের ৬০ লাখ ডলারের চেয়ে এগিয়ে, আর ডেমোক্র্যাট দলগুলো খরচে এগিয়ে ২ কোটি ৮০ লাখ বনাম ২ কোটি ২০ লাখ ডলারে।
মেইনে রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের আসনটি ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম বড় সুযোগ। ২০২৪ সালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া এই রাজ্যে কলিন্সের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন, রাজ্য সিনেটের সাবেক প্রেসিডেন্ট। দলটির মূল মনোনীত প্রার্থী গ্রাহাম প্ল্যাটনার নিজের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করে সরে দাঁড়ানোর পর জুলাইয়ে লড়াইয়ে নামেন জ্যাকসন। কলিন্স ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব রাখার চেষ্টা করছেন; একটি বিতর্কে তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি প্রেসিডেন্টের প্রিয় সিনেটর নন এবং ট্রাম্প মেইনে প্রচারেও আসবেন না। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হামলার ঘটনায় অভিশংসনের পর ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন কলিন্স। তবে ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, কলিন্স কেবল তখনই ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দেন, যখন তাতে ফল বদলায় না; সুপ্রিম কোর্টে ব্রেট কাভানোর নিয়োগ নিশ্চিত করতে সাহায্য করার দায়ও তারা তার ওপর চাপাতে চায়, যার পরিণতিতে গর্ভপাতের ফেডারেল অধিকার বাতিল হয়। অন্যদিকে বিতর্কে কলিন্সকে ‘চুপ করুন’ বলা এবং ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করায় সমালোচিত জ্যাকসন। অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত তহবিলে জ্যাকসন প্রায় ২ কোটি ৬৯ লাখ ডলার নিয়ে কলিন্সের ২ কোটি ৫২ লাখ ডলারের চেয়ে সামান্য এগিয়ে, তবে রিপাবলিকান গোষ্ঠীগুলো খরচে বড় ব্যবধানে এগিয়ে—৭ কোটি ৬০ লাখ বনাম ৪ কোটি ডলার।
নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকানরা কার্যত আসনটি ছেড়ে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। গত সপ্তাহে গ্রিনভিলে এক সমাবেশে ট্রাম্প নিজেই সমর্থকদের বলেন, ডেমোক্র্যাট সাবেক গভর্নর রয় কুপার তাদের পরবর্তী সিনেটর হতে যাচ্ছেন—এটা ‘পাগলামি’। ২০২৪ সালে ট্রাম্প রাজ্যটিতে মাত্র ৩ পয়েন্টে জিতেছিলেন। রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস অবসর নেওয়ায় আসনটি উন্মুক্ত; ট্রাম্প উত্তরসূরি হিসেবে রিপাবলিকান জাতীয় কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাইকেল হোয়াটলিকে নিয়োগ দিলেও তহবিলে তিনি কুপারের ধারেকাছেও নেই। কুপার সংগ্রহ করেছেন ৫ কোটি ডলার, হাতে আছে ৯০ লাখ ডলার; হোয়াটলের সংগ্রহ ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার, হাতে মাত্র ৯ লাখ ডলার। জরিপে কুপার দুই অঙ্কের ব্যবধানে এগিয়ে। রাজ্যটির পূর্বাঞ্চলে একটি কমিউনিটি ফুড প্যান্ট্রি পরিচালনাকারী কেলি স্পিভি আল জাজিরাকে বলেন, দাম বাড়ায় পরিবারগুলোকে ওষুধ, খাবার আর শিশুর ডে-কেয়ারের মধ্যে বেছে নিতে হচ্ছে।
ওহাইওতে শ্রমিক সংগঠন ও শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রাখা ডেমোক্র্যাট শেরড ব্রাউন শিল্পসমৃদ্ধ ‘রাস্ট বেল্ট’ রাজ্যটির ভোটারদের ফেরাতে লড়ছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর জন হাস্টেড, যাকে জেডি ভ্যান্স ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়ে সিনেট ছাড়ার পর সেই আসনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। জীবনযাত্রার ব্যয় রাজ্যটিতে বড় প্রচার ইস্যু। এই বিশেষ নির্বাচনের জয়ীকে পূর্ণ ছয় বছরের মেয়াদের জন্য ২০২৮ সালে আবার ব্যালটে উঠতে হবে। বাইরের গোষ্ঠীগুলোর খরচে দুই পক্ষই নয় অঙ্কের অর্থ ঢেলেছে—রিপাবলিকানরা ২৩ কোটি ২০ লাখ ডলার, ডেমোক্র্যাটরা ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত তহবিলে ব্রাউন ৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার নিয়ে হাস্টেডের প্রায় ২ কোটি ডলারের তিন গুণেরও বেশি এগিয়ে; জরিপে ব্রাউন এগিয়ে তিন থেকে পাঁচ পয়েন্টে।
টেক্সাসে ১৯৯৪ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জেতেননি। রাজ্য প্রতিনিধি জেমস ট্যালারিকো সেই ধারা ভাঙতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন, যাকে ট্রাম্প সমর্থন দিয়েছেন; রান-অফে তিনি বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর জন কর্নিনকে হারিয়ে মনোনয়ন পান। ২০২৪ সালে ট্রাম্প টেক্সাসে প্রায় ১৪ পয়েন্টে জিতলেও আসনটি ধরে রাখতে রিপাবলিকান বাইরের গোষ্ঠীগুলো ইতিমধ্যে ৩০ কোটি ডলার খরচ করেছে। ইলন মাস্ক প্যাক্সটনের পক্ষে একটি রিপাবলিকান সুপার পিএসিকে ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার দিয়েছেন। জরিপে ট্যালারিকো সামান্য এগিয়ে অথবা প্যাক্সটনের সঙ্গে সমানে সমান অবস্থানে আছেন।




