ভৈরবে মেঘনার তীরে ময়লার স্তূপ, নদীতে মিশছে পৌর বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের পানি
কিশোরগঞ্জের ভৈরব হাওরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। মেঘনা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বন্দরনগরী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসচেতনতার অভাব আর যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় দিন দিন দূষিত হচ্ছে ভৈরবের মেঘনা নদী।
বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিক ও অপচনশীল বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণে নষ্ট হচ্ছে পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ। এতে হুমকির মুখে পড়ছে নদীর জলজ প্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য।
আয়তনে ছোট হলেও ভৈরব ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্জ্যের পরিমাণ, কিন্তু সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো। শহরের বিভিন্ন স্থানে নদীর তীর ঘেঁষে দেখা যায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। কোথাও সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে পৌরসভার বর্জ্য।
কোথাও আবার নদীর পাড়ে জমে থাকা প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনা বৃষ্টির পানি আর নদীর স্রোতের সঙ্গে মিশে পানিতে গিয়ে পড়ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে দূষিত পানি নদীতে মিশছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে আশপাশের পরিবেশেও।
স্থানীয় বাসিন্দা এহসানুল হক পিন্টু বলেন, নদীকে কেন্দ্র করেই আজকের আধুনিক ভৈরব শহরের বিকাশ ঘটেছে। অথচ পরিকল্পনার অভাব ও জনসচেতনতা না থাকায় নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল-বিলগুলো অবাধে ভরাট করা হচ্ছে। বাড়তি জনসংখ্যার আবাসন তৈরির জন্য একটি চক্র এসব জলাশয় ভরাট করছে, এতে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নদীতে সরাসরি পৌরসভার পয়োনিষ্কাশন লাইনের পানি এবং মানুষের ফেলা অপরিকল্পিত বর্জ্য মিশছে। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এবং জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক নজরুল ইসলাম রিপন বলেন, নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শুধু সাময়িক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম যথেষ্ট নয়; এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ এবং নদীর তীর ও আশপাশে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম দরকার।
ভৈরব পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কেএম মামুনুর রশীদ বলেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। তবে ভৈরবে নিজস্ব ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা এবং নদীর পাশে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের অনেকেই আশপাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলেন। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে পৌরসভার পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি নদী রক্ষায় করণীয় নির্ধারণ এবং নজরদারি বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, মেঘনা নদীর দূষণ রোধে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীর তীর দখল ও দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে খাল-বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।



