মধুমতীতে ১১ নৌকার বাইচ আর দুই দিনের গ্রামীণ মেলা, দুই তীরে লাখো মানুষের ভিড়
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার এলাংখালী ঘাট এলাকায় মধুমতী নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের গান আর দর্শনার্থীদের করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই তীর, আর প্রতিযোগিতা দেখতে সমবেত হন লাখো মানুষ।
গত রোববার, ১ নভেম্বর বিকেলে মধুমতী নদীতে শুরু হয় বর্ণিল এই প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সুসজ্জিত ১১টি নৌকা এতে অংশ নেয়। রঙিন টি-শার্ট পরা মাঝিরা বাদ্যের তালে তালে গান গেয়ে বৈঠার ছন্দে নৌকা এগিয়ে নিতে থাকেন।
প্রতিযোগিতাকে ঘিরে নদীর দুই পাড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। এক পাশে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা, অন্য পাশে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা। দুই উপজেলার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দুই তীর জনসমুদ্রে পরিণত হয়, করতালি ও উল্লাসে দর্শনার্থীরা মাঝিদের উৎসাহিত করেন।
গ্রামীণ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও উৎসবের মেলবন্ধনে দিনব্যাপী এই আয়োজন বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে দুই দিন আগে থেকেই মধুমতীর তীরে বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা।
মেলায় শত শত অস্থায়ী দোকানে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল। মিষ্টি, জিলাপি, বাতাসা, কদমা, বিভিন্ন ধরনের সন্দেশ ও পিঠাপুলির পাশাপাশি শিশুদের জন্য ছিল রঙিন বেলুন, কাঠের খেলনা এবং বাঁশ-বেতের তৈরি কুটির শিল্পসামগ্রী। মাটির তৈরি নানা শৌখিন পণ্যের দোকানও মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল।
নৌকা বাইচ উপভোগ করতে দূরদূরান্ত থেকে আসেন বৃদ্ধ, তরুণ, নারী ও শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। প্রতিবছর এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে মহম্মদপুর উপজেলার বিভিন্ন বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের সমাগম ঘটে। অনেক পরিবারের কাছে দিনটি ঈদের আনন্দের মতোই বিশেষ, আর এ উপলক্ষে পুরো উপজেলায় তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম সামাল দিতে নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, নদী আমাদের জীবন, নদীর প্রবাহের সঙ্গে আমাদের জীবনের প্রবাহ জড়িত, তাই নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নদী বেঁচে থাকলে আমাদের সংস্কৃতিও বেঁচে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ মেলা, লাঠিখেলা ও নৌকা বাইচ বাংলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব আয়োজন ধরে রাখা আমাদের দায়িত্ব, আর গ্রামবাংলার সংস্কৃতি আমাদের শেকড়ের পরিচয় বহন করে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন মাগুরা জেলা পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন, মাগুরা জেলা পরিষদের প্রশাসক আলী আহম্মেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল কাদের, মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদমান আকিব, মহম্মদপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অধ্যক্ষ মৈমুর আলী মৃধা, কাজী সালিমা হক মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এসএম ইউনুস আলী সরদার, মাগুরা জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক সাইদুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শফিক এবং মহম্মদপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আজিজুর রহমান টুটুলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
রাতে প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে মধুমতীর তীরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা তুলে ধরে।



