রক্ষীবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছিল আওয়ামী লীগ, জুলাই জাদুঘরের সেমিনারে বক্তারা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, ১৯৭২ সালের পর আওয়ামী লীগ রক্ষীবাহিনীকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিপীড়ন এবং নিজেদের অন্যান্য রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছিল।
সোমবার (২ নভেম্বর) জুলাই জাদুঘরে ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজ’-এর দ্বিতীয় পর্বে ‘রক্ষীবাহিনী ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ শীর্ষক সেমিনারে অংশ নিয়ে বক্তারা এই মন্তব্য করেন।
প্রধান বক্তা লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, অনেকেই ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ডকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেন, কিন্তু এর মাধ্যমে ১৯৭২ সাল থেকে চলা রক্ষীবাহিনীর শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অস্বীকার করা হয়।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর রক্ষীবাহিনীকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছিল আওয়ামী লীগ। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের নিপীড়ন করতে রক্ষীবাহিনীকে আওয়ামী লীগ নিজেদের পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত করেছিল এবং সে সময় রক্ষীবাহিনীর কাছে নিপীড়িত হওয়া সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ছিল জাসদের নেতা-কর্মীরা।
বিচারহীনতার সংস্কৃতিই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে জিইয়ে রাখছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের পর রক্ষীবাহিনীকে বিচারের আওতায় আনা উচিত ছিল, কিন্তু সবাই তাদের নিয়ে রাজনীতি করলেও কেউ বিচারের কথা বলেনি।
মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, রক্ষীবাহিনী ভয়ংকরভাবে নারী-পুরুষনির্বিশেষে নির্যাতন চালাত। যেসব স্থানে জাসদসহ বিরোধী দলের বিস্তার ছিল, সেসব স্থানে রক্ষীবাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
নূর খান লিটন আরও বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে শামসুন্নাহার হলের মাঝের রাস্তায় অনেক বেওয়ারিশ লাশ পড়ে থাকত; জোর সম্ভাবনা আছে, এগুলো রক্ষীবাহিনী ফেলে রেখে যেত, যেন মানুষের ভেতর ভয়ের সঞ্চার হয়।
আলোচক লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে একটি ট্রুথ কমিশন গঠন জরুরি, যার মাধ্যমে ১৯৭২ সাল থেকে গত পঞ্চাশ বছরের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সত্য জানা যাবে।
সভাপতির বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ বলেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে ভয়ের নাম ছিল রক্ষীবাহিনী, এর বাইরে ভয়ের আরও একটি শব্দ ছিল বাকশাল। সেমিনার সিরিজের প্রথম পর্ব ছিল বাকশাল নিয়ে, দ্বিতীয় পর্বে আলোচনার বিষয় ছিল রক্ষীবাহিনী।
এহসান মাহমুদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে হলে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। জাদুঘরে এই আলোচনা জারি রাখা হবে বলে তিনি জানান।
সেমিনারের দ্বিতীয় পর্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। জাদুঘর জানিয়েছে, সেমিনার সিরিজটির পরের পর্বগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হবে।



