দুই বছরে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন, চাপে রপ্তানি আয়ও
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ শুধু খাদ্যপণ্য নয়, দেশের মৎস্য অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদী ও সাগরকেন্দ্রিক জেলেদের জীবিকা থেকে শুরু করে আড়ত, পরিবহন, বরফকল, পাইকারি ও খুচরা বাজার—সব মিলিয়ে ইলিশকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এ খাতের সরবরাহ, বাজারদর ও রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার টন। ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টনে পৌঁছায়। কিন্তু এরপর উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমেছে। দুই অর্থবছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদিত মূল্য ছিল প্রায় ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে এই একটি প্রজাতি থেকে।
ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়াতে প্রতিবছর প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং জাটকা সংরক্ষণে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়। এসব উদ্যোগের ফলে গত দুই দশকে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক পতন দেখাচ্ছে, শুধু মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা ও অভিযান দিয়ে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
নদীদূষণ, প্রজননক্ষেত্রের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, ডুবোচর সৃষ্টি এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার মতো বিষয় ইলিশের বিচরণ ও বংশবিস্তারে প্রভাব ফেলছে। ফলে প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ ও সারা বছর নজরদারি জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
দেশীয় বাজারে ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় উৎপাদন কমলে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে মৌসুমে বড় আকারের ইলিশের দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জেলে, আড়তদার, পরিবহনকারী, বরফকল ও মাছ ব্যবসায়ীরাও উৎপাদন ও আহরণ কমে যাওয়ার প্রভাবের মুখে পড়েন। সরবরাহ কমে গেলে শুধু ভোক্তা নয়, পুরো সরবরাহশৃঙ্খলেই ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা বাড়ে।
রপ্তানি বাজারেও বাংলাদেশের ইলিশের পরিচিতি রয়েছে, বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এর চাহিদা উল্লেখযোগ্য। তবে উৎপাদন বেশি থাকলেও রপ্তানি আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতে ইলিশ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ১ কোটি ৬৪ লাখ ৩০ হাজার ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৫৩ লাখ ৭০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। ওই অর্থবছরে ভারতে রপ্তানির পরিমাণও ছিল তুলনামূলক কম। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকলেও রপ্তানির ধারাবাহিকতা ও পরিমাণ ধরে রাখা যায়নি।
ইলিশ খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ, হিমায়িত পরিবহন এবং রপ্তানি অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় বাজারে সরবরাহ ও রপ্তানির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা, জেলেদের বিকল্প আয় ও খাদ্যসহায়তা নিশ্চিত করা এবং নদী ও মোহনার পরিবেশ রক্ষা করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হতে পারে। উৎপাদন ও সরবরাহে স্থিতিশীলতা ফিরলে দেশের মৎস্য অর্থনীতি, জেলেদের জীবিকা এবং রপ্তানি আয়—তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

