৩০ হাজার টাকা মজুরির আন্দোলনে মঙ্গলবারও সংঘর্ষ, বন্ধ ৩০৬ কারখানা; উত্তরায় বিজিএমইএর বৈঠক

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর)ও থামেনি। রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ ও শ্রমিকসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২ নভেম্বর) দেশের প্রধান তিনটি শিল্পাঞ্চলের ৬৭৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ ছিল। এসব কারখানায় কর্মরত ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৭২ জন শ্রমিক কাজ না করেই বাড়ি ফিরে যান। মঙ্গলবার সকাল ১১টা পর্যন্ত আরও ৩০৬টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল; এসব কারখানায় প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কর্মরত।
মঙ্গলবার সকাল ১১টা পর্যন্ত গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের ১৬১টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। সাভার, আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় বন্ধ ছিল ৯৩টি এবং রাজধানীর মিরপুরে ৫২টি কারখানা। বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ওই সময় চালু ছিল ১ হাজার ৮২৮টি।
শ্রমিক অসন্তোষ, কর্মবিরতি ও কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বিগ্ন পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএর কার্যালয়ে বর্তমান ও সাবেক নেতাদের পাশাপাশি কয়েকজন শীর্ষ উদ্যোক্তা বৈঠক করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে কারখানার নিরাপত্তা, উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং প্রয়োজনে কারখানা বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্তের বিষয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে জানানোর কথা থাকলেও তা হয়নি।
এর আগে রবিবার (১ নভেম্বর) বিজিএমইএর জরুরি সভায় শ্রমিকেরা কাজে ফিরে না এলে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। কয়েকজন উদ্যোক্তা সোমবার থেকেই কারখানা বন্ধ রাখার পক্ষে মত দিলেও অধিকাংশ মালিক উৎপাদন চালু রাখার পক্ষে ছিলেন।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩(১) ধারায় বেআইনি ধর্মঘটের কারণে কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠান বা তার কোনো অংশ বন্ধ রাখতে পারে; এ ক্ষেত্রে বন্ধ থাকা সময়ের জন্য সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের মজুরি না দেওয়ার বিধান রয়েছে। মালিকদের আলোচনায় এই ধারার প্রয়োগ, অর্থাৎ ‘কাজ নেই, বেতন নেই’ নীতিতে কারখানা বন্ধের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এর আগে বলেছিলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে ফিরে যাবেন বলে তাঁরা আশা করছেন। তবে আন্দোলনের নামে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে সেটিকে ভিন্ন উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গত রবিবার (১ নভেম্বর) ছয় সদস্যের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন যথাক্রমে এ বি এম সামছুদ্দিন ও বাবুল আখতার। এ ছাড়া বোর্ডে স্থায়ী সদস্য হিসেবে রয়েছেন আসিফ আইয়ুব ও আনোয়ার হোসাইন এবং নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।
তবে বোর্ড গঠনের পরও প্রথম সভার তারিখ নির্ধারণ না হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, দ্রুত সভা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে এবং আগেরবারের মতো দীর্ঘ সময় নেওয়া হবে না। মজুরি বোর্ডের শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাবুল আখতারও দ্রুত সভা ডেকে মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, দ্রুত কাজ শেষ করা গেলে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা সম্ভব হলে আগামী জানুয়ারি থেকে শ্রমিকেরা নতুন বেতন পেতে পারেন।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, মজুরি নিয়ে এখন পর্যন্ত মালিকপক্ষের অসহযোগিতার কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই। আইন অনুযায়ী পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছরের মধ্যে মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে একমত হয়েছে। তিনি বলেন, এতে মালিকদের আর্থিক চাপ তৈরি হলেও তাঁরা বিষয়টি মেনে নেওয়ার অবস্থানে রয়েছেন। তবে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কোনোভাবেই স্বাভাবিক আন্দোলনের অংশ হতে পারে না।
মিরপুরের আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিক শোয়েব ইসলাম বলেন, তাঁদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। নাশকতার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, শ্রমিকেরা নিজেদের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করছেন। কোনো শ্রমিক অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার বা হয়রানির শিকার হলে তাঁরা তারও প্রতিবাদ করবেন। শেফালী বেগম নামে আরেক নারী শ্রমিক বলেন, শুধু আশ্বাস দিয়ে আর তাঁদের কাজে ফেরানো যাবে না; মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণা দিতে হবে এবং আন্দোলনে অন্যায়ভাবে আটক শ্রমিকদের মুক্তি দিতে হবে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান বেতনে নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম সামাল দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। এ কারণে তাঁরা ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি জানাচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, মজুরি বোর্ড গঠন করাই দাবির সমাধান নয়; তাঁরা দ্রুত নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা চান।
শ্রমিকদের আন্দোলনে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ও রাজনৈতিক উসকানির অভিযোগ তুলেছে পুলিশ ও শ্রমিকনেতাদের একটি অংশ। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বিভিন্ন এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; তাঁর দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কেউ পোশাকশ্রমিক নন। ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনও অভিযোগ করেছেন, বোরকা পরিহিত ও হেলমেটধারী একটি গোষ্ঠী শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছে; তাদের অর্থের জোগানদাতাদের শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। তবে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না; আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে একটি পক্ষ ফায়দা লুটতে চাইছে। তিনি শ্রমিকদের শান্ত থেকে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আক্তারও বলেন, সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, তাই শ্রমিকদের শান্ত থেকে কাজে ফিরে যাওয়া উচিত; একই সঙ্গে দ্রুত মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এদিকে গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছে যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনকে।



