অকাস চুক্তিকে ‘সবচেয়ে খারাপ ও ঝুঁকিপূর্ণ’ সিদ্ধান্ত বলল অস্ট্রেলিয়ার জনতদন্ত, বাতিলের আহ্বান

অস্ট্রেলিয়ার ৩৬৮ বিলিয়ন ডলারের অকাস পরমাণু সাবমেরিন চুক্তিকে দেশটির কোনো সরকারের নেওয়া ‘সবচেয়ে খারাপ, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছে একটি জনতদন্ত। তদন্তটি পরিকল্পনাটি অবিলম্বে বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে।
তদন্তটির নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবেক লেবার সিনেটর ও মিডনাইট অয়েল ব্যান্ডের ফ্রন্টম্যান পিটার গ্যারেট এবং সাবেক প্রতিরক্ষাপ্রধান অ্যাডমিরাল ক্রিস ব্যারি। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই চুক্তির সমালোচকদের প্রাধান্য থাকা তদন্তটি নতুন ঘাঁটির পরিকল্পনা স্থগিত রাখার সুপারিশ করেছে এবং সাবেক মরিসন সরকারের সময় স্বাক্ষরিত চুক্তিটি নিয়ে একটি রাজকীয় কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘সারেন্ডারিং অস্ট্রেলিয়া: দ্য অকাস ডিসেপশন’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী পরমাণু সাবমেরিনের উপস্থিতির কারণে অস্ট্রেলিয়া চীনের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। তদন্তের ভাষ্য অনুযায়ী, অকাস অস্ট্রেলিয়ার সার্বভৌমত্বকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে এবং পরমাণু অপ্রসার রোধে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতিকেও দুর্বল করে দেয়।
প্রতিবেদনটি চুক্তির দ্বিতীয় স্তম্ভ নতুন করে সাজানোর কথাও বলেছে। এই স্তরের আওতায় প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ভাগাভাগির বিষয়টি রয়েছে। পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্কের মৌলিক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দেশজুড়ে শুনানি ও এক হাজারের বেশি জনজমা নেওয়ার পর তদন্তটি অকাস ঘোষণার পর থেকে পাঁচ বছরে যাচাই ও তদারকির ঘাটতির দিকে আঙুল তুলেছে। এতে অডিটর জেনারেল ও ফেডারেল পার্লামেন্টকে স্বতন্ত্র পর্যালোচনা শুরু করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে গ্যারেট বলেছেন, ক্ষমতায় আসার পর লেবার সরকার এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তিটির পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘গোপনে জন্ম নেওয়া অকাস প্রতিষ্ঠিত প্রতিরক্ষা ও সংসদীয় তদারকির চর্চাকে এড়িয়ে গেছে।’
গ্যারেট আরও বলেছেন, পার্থের স্টার্লিং প্রতিরক্ষা এলাকা ‘কার্যত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে দুই হাজার পর্যন্ত মার্কিন সেনা সদস্য থাকতে পারেন। তাঁর মতে, কাছের রকিংহাম ও ফ্রেম্যান্টলের মতো জনপদগুলো তখন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করা ব্যারি বলেছেন, ‘অকাস সাবমেরিন পরিকল্পনা টেকসই নয়।’ তিনি বলেছেন, ‘এখন সময় এসেছে আমাদের সরকারের নেতৃত্ব নেওয়ার। অকাস সাবমেরিন পরিকল্পনা এখনই বাতিল করুন এবং জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াগুলো নতুন করে গড়ে তুলুন।’
পরমাণু সাবমেরিন পেতে এই চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল তৎকালীন অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী মরিসন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সময়ে, আর লেবার দল এতে সমর্থন দিতে রাজি হয়েছিল। চুক্তির অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তির উন্নয়নে অর্থ দিচ্ছে এবং ২০৩২ সাল নাগাদ সেকেন্ডহ্যান্ড ভার্জিনিয়া-শ্রেণির পরমাণু সাবমেরিন পেতে শুরু করার কথা রয়েছে।
তবে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য সাবমেরিন উৎপাদনে বিলম্ব ও খরচ বেড়ে যাওয়ায় অস্ট্রেলিয়া আদৌ সেগুলো পাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট এ নিয়ে এক বছরব্যাপী পর্যালোচনা চালিয়েছে, আর ২০২৫ সালে পেন্টাগনের একটি তদন্তের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প অকাসের প্রতি সমর্থন দিতে সম্মত হন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী পল কিটিং ও ম্যালকম টার্নবুল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্যারেথ ইভান্স ও বব কার, পরিবেশ ও নিরাপত্তা আন্দোলনের কর্মী এবং লেবার দলের একাংশের বিশ্বাস, অকাস অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় স্বার্থে নেই। গ্যারেট সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় সাবমেরিন পাঠাতে রাজি হবেনই—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। তাঁর ভাষায়, ‘কোনো অর্থ ফেরতের সুযোগ নেই, অংশীদার দেশগুলোর ওপর প্রয়োগযোগ্য কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, আর কিছু ভুল হলে প্রতিকারেরও কোনো পথ নেই।’
তদন্তটির হিসাব অনুযায়ী, অকাসের কারণে সৃষ্ট পারমাণবিক বর্জ্য সামলাতে অতিরিক্ত ১৮০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। সাবমেরিন বহরের বর্জ্যের জন্য অস্ট্রেলিয়া এখনো কোনো স্থায়ী সংরক্ষণ স্থান চিহ্নিত করেনি; রিঅ্যাক্টর কোর ও ব্যবহৃত জ্বালানি থেকে আসা উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য হাজার হাজার বছর ধরে বিষাক্ত থেকে যাবে। সরকারের পছন্দের হিসাবে চুক্তিটির মোট খরচ তার পুরো মেয়াদে জিডিপির শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ। সময়সূচি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রথম ভার্জিনিয়া-শ্রেণির সাবমেরিন ২০৩২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর কথা, এরপর প্রতি চার বছরে একটি করে আসবে, আর অস্ট্রেলিয়ায় তৈরি বিশেষ এসএসএন-অকাস মডেল ২০৪২ সালে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।



