পোশাকের বাইরে পাঁচ খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ২৭ শতাংশ, চার মাসে মোট আয় ১ হাজার ৭০৯ কোটি ডলার
তৈরি পোশাকের বাইরে পাঁচটি বিকাশমান খাতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে দেশের মোট রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৭০৯ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে রাসায়নিক পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, বিশেষায়িত বস্ত্র, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং প্রকৌশল পণ্য—এই পাঁচ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত।
খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রাসায়নিক পণ্য। চার মাসে এই খাত থেকে আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি।
রাসায়নিক খাতের এই প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে ওষুধশিল্প। চার মাসে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১০ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদেশে বাংলাদেশি ওষুধের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায় এই প্রবৃদ্ধি এসেছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ হাসান আরিফ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, রাসায়নিক পণ্য, বিশেষ করে ওষুধশিল্পের এই অগ্রগতি দেশে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ার প্রতিফলন, আর রপ্তানি বহুমুখীকরণে এই খাত ক্রমেই সম্ভাবনাময় চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।
পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৩ লাখ ৭০ হাজার ডলারে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। বিশ্ববাজারে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল পণ্যের চাহিদা বাড়ায় এই খাতের সামনে নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জুট গুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেজিইএ) ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, আফ্রিকার দেশগুলোসহ নতুন বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে। কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এতে স্থানীয় শিল্পের জন্য কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং উচ্চমূল্যের পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে গুরুত্ব দিলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় বাড়বে।
বিশেষায়িত বস্ত্র খাতের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কাপড়, প্রযুক্তিনির্ভর বস্ত্র এবং স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহৃত বিশেষ উপকরণ এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। হাসান আরিফ বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদন সক্ষমতা ও উচ্চমূল্য সংযোজনের মাধ্যমে এই খাত রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে চার মাসে আয় হয়েছে ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ডলার, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার উদ্যোগ, উচ্চমূল্যের পণ্যে গুরুত্ব এবং বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা বাড়াকে এই বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হাসান আরিফ বলেন, পণ্যের মান, কমপ্লায়েন্স ও নতুন পণ্য উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিলে উচ্চমূল্যের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
প্রকৌশল পণ্য খাত থেকে আয় হয়েছে ২৪ কোটি ৭২ লাখ ৩০ হাজার ডলার, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি। সাইকেল, যন্ত্রপাতির যন্ত্রাংশ, শিল্পকারখানার বিভিন্ন উপকরণ ও হালকা প্রকৌশল পণ্য এই খাতের আওতায় রয়েছে। হাসান আরিফ বলেন, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়লে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে এই খাত রপ্তানি আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।
ইপিবির তথ্য বলছে, পাঁচটি খাতের প্রতিটিতেই প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি—রাসায়নিক পণ্যে তা প্রায় পাঁচ গুণ এবং পাট ও পাটজাত পণ্যে চার গুণের বেশি। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এখনো তৈরি পোশাক খাত থেকে এলেও অন্য খাতগুলোর এই অগ্রগতি আয়ের উৎস সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করছে। হাসান আরিফ বলেন, এই ধারা ধরে রাখতে নীতিগত সহায়তা, নতুন বাজার অনুসন্ধান, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি, এবং দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বহুমুখী শিল্পভিত্তির বিকল্প নেই।


