মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে চাপে বিশ্বের বিমান খাত, বাংলাদেশের প্রবাসী যাত্রী ও কার্গোতেও প্রভাব
যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে। সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে বিকল্প পথে চলাচল, ফ্লাইট বাতিল ও সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ছে।
এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং যাত্রী পরিবহনে অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে সংস্থাগুলোর মুনাফায় চাপ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কারণে এ পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন, প্রবাসী যাত্রী চলাচল ও কার্গো ব্যবসায়ও।
আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) ৭ জুন প্রকাশিত ২০২৬ সালের আর্থিক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত বিঘ্ন ও জেট জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে বিমান সংস্থাগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা কমে ২৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। ২০২৫ সালে এই মুনাফা ছিল ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
সংস্থাটির আগের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালের মুনাফা ৪১ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছিল। নতুন হিসাবে মুনাফার হার ২০২৫ সালের ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।
জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধিকে এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে আইএটিএ। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বিমান সংস্থাগুলোর জ্বালানি খাতে ব্যয় ছিল ২৫২ বিলিয়ন ডলার; ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৩৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে জেট ফুয়েলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার থেকে বেড়ে ১৫২ ডলারে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। ফলে বিমান সংস্থাগুলোর মোট পরিচালন ব্যয়ের ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ জ্বালানি খাতে ব্যয় হতে পারে, যা আগের বছর ছিল ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সংস্থাগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএটিএ। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালে এই অঞ্চলের বিমান সংস্থাগুলোর সম্মিলিত নিট লোকসান ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে; আগের বছর তারা ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছিল। ফ্লাইট বাতিল, আকাশসীমায় বিধিনিষেধ এবং ট্রানজিট যাত্রী কমে যাওয়াকে এর প্রধান কারণ বলা হয়েছে। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রী পরিবহনের চাহিদা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ কমতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সামরিক তৎপরতার ঝুঁকি থাকায় বিমান সংস্থাগুলোকে রুট ও সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করতে হচ্ছে। জিপিএস জ্যামিং ও স্পুফিংয়ের মতো নেভিগেশনগত সমস্যাও উড়োজাহাজ চলাচলে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন তৈরি করেছে।
বিকল্প পথে চলাচলে যাত্রার সময় বাড়ে, জ্বালানি বেশি লাগে এবং উড়োজাহাজ ও ক্রু ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এসব ব্যয় সামাল দিতে কোনো কোনো সংস্থা টিকিটের দাম বাড়াচ্ছে, আবার কম লাভজনক রুটে ফ্লাইট কমানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই সংকটের প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। তাঁদের যাতায়াত, ওমরাহযাত্রী পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক ট্রানজিটের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ফ্লাইট বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তন হলে প্রবাসী কর্মী, ওমরাহযাত্রী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ভোগান্তি বাড়ে এবং বিমান সংস্থাগুলোর আয় ও পরিচালন পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হয়।
এ পরিস্থিতিতে বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার, ফ্লাইটের সময়সূচি সমন্বয় এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্টরা। কেএম মজিবুল হক মনে করেন, তায়েফ ও মদিনার মতো বিমানবন্দরে ফ্লাইটের সুযোগ বাড়ানো গেলে প্রয়োজনে যাত্রীরা সড়কপথে গন্তব্যে যেতে পারবেন। তবে এ ধরনের উদ্যোগে নিরাপত্তা, ভিসা, স্থলপথে যাতায়াত ও অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কত দিন স্থায়ী হবে, তার ওপর বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতের ক্ষতির মাত্রা অনেকাংশে নির্ভর করছে। যাত্রীদের ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি বিকল্প রুট ও জরুরি ফ্লাইট ব্যবস্থাপনায় সরকারি সংস্থা এবং বিমান পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


