৩২ বছর পর শ্রেণিকক্ষে ফিরে ৫৪ বছর বয়সে এইচএসসি পাস গাজীপুরের মজনুর, পেলেন জিপিএ ৪.৬৩

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ভিটিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন মজনু ৫৪ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে চলতি বছর জিপিএ-৪.৬৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তার এই অর্জন এলাকায় আলোচনার পাশাপাশি অনেককে নতুন করে শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
মজনু পেশায় ব্যবসায়ী। তার বাবার নাম নিজাম উদ্দিন কাইয়া। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক।
১৯৯১ সালে ত্রিমোহনী বিডি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন মজনু। এরপর বরমী ডিগ্রি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু উচ্চতর গণিত বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় তার শিক্ষাজীবনে ছেদ পড়ে। হতাশা থেকে পরের বছর আর পরীক্ষা দেননি তিনি।
এরপর জীবনের বাস্তবতা তাকে নিয়ে যায় অন্য পথে। শুরু করেন মুরগি পালনের ব্যবসা। ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন কর্মজীবনে। বিয়ের পর সংসারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কেটে যায় দীর্ঘ ৩২ বছর। সংসার, সন্তান, ব্যবসা আর পারিবারিক দায়িত্বের ব্যস্ততায় শিক্ষাজীবনের স্বপ্ন সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছিল।
তবে শিক্ষাজীবনের সেই অসমাপ্ত অধ্যায় কখনো পুরোপুরি ভুলতে পারেননি মজনু। সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে নেন সাহসী সিদ্ধান্ত। পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে ভর্তি হন গাজীপুরের পূবাইল টেকনিক্যাল কলেজে। একদিকে পোলট্রি ব্যবসা, অন্যদিকে সংসারের দায়িত্ব; এর মধ্যেই সময় বের করে আবারও শুরু করেন নিয়মিত পড়াশোনা।
সব বাধা পেরিয়ে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন মজনু। ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, জিপিএ-৪.৬৩ পেয়ে তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। বয়সের ভার কিংবা দীর্ঘ বিরতির ভয়—কোনোটিই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
শুধু নিজের শিক্ষাজীবনেই নয়, শিক্ষা প্রসারেও আগ্রহ রয়েছে মজনুর। বর্তমানে তিনি ভিটিপাড়া কোব্বাত হামিদ কাইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মজনু জানান, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী এবং যারা নানা কারণে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন, তাদের অনুপ্রেরণা জোগাতেই অসমাপ্ত শিক্ষাজীবন শেষ করার উদ্যোগ নেন তিনি। এখানেই থেমে থাকতে চান না তিনি। এবার স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পর্যায়ক্রমে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করতে চান। তার বিশ্বাস, প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে যে কোনো বয়সেই নতুন করে শুরু করা সম্ভব।
ছেলের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত তার বৃদ্ধ মা আনোয়ারা খাতুন। ছেলেকে আবারও পড়াশোনায় ফিরে আসতে দেখে গর্বিত তিনি। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছেলে ভালো লেখাপড়া করছে, এটা সত্যিই গর্বের।’
মজনুর এই অর্জনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন শিক্ষকরাও। ভিটিপাড়া কোব্বাত হামিদ কাইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রজব আলী মোড়ল বলেন, ‘লেখাপড়ার কোনো বয়স নেই। যে কোনো বয়সে শিক্ষালাভ করা একজন মানুষের অধিকার। মজনু কাইয়া একজন শিক্ষানুরাগী। তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সদস্য। আমরা তার ফলাফলে গর্বিত।’




