রাজশাহীতে সার সংকট নিয়ে সংসদ সদস্যের অভিযোগ, মজুত বেশি থাকার কথা জানালেন কৃষিমন্ত্রী

রাজশাহী বিভাগের আট জেলার সার, বীজ, সেচ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসহ সার্বিক কৃষি উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সারের সংকট নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সভায় বিএনপির এক সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, কৃষকেরা সারের ঘাটতির মুখে পড়ছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেছেন, গত বছরের তুলনায় দেশে মজুত বেশি আছে, সারের সংকট নেই।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের সম্মেলন কক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাইদ চাঁদ।
সভায় আবু সাইদ চাঁদ বলেন, নারীসহ কৃষকেরা সার সংগ্রহের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। এতে প্রায়ই তাদের এক দিনের মজুরির ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘কিছু কৃষক তাদের জমির জন্য আরও বেশি সারের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মাত্র আধা বস্তা বা এক মণ সার পাচ্ছেন। আমি নিজেও একজন কৃষক এবং গ্রামে থাকি। কৃষকেরা কী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, তা আমি দেখি। ডিলাররা যাই বলুক না কেন, রাজশাহীতে সারের সংকট রয়েছে।’
সংসদ সদস্য বিশেষ করে ট্রিপল সুপারফসফেট (টিএসপি) সারের সরবরাহ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পেঁয়াজ ও রসুন চাষের জন্য এই সার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সভায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও চলতি মৌসুমের জন্য সারের বরাদ্দ বাড়ানোর অনুরোধ জানান মন্ত্রীর কাছে।
আবু সাইদ চাঁদ অভিযোগ করেন, কিছু ব্যবসায়ী বারবার সার পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়লেও সামান্য জরিমানা দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজ এলাকার একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, একাধিকবার সার পাচারের দায়ে এক ডিলারকে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ধরনের শাস্তি অনিয়ম রোধে যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করে তিনি অনিয়মে জড়িত ডিলারদের লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানান।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু ডিলার নিজেরা ব্যবসা পরিচালনা না করে ডিলারশিপ অন্যদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন বা হস্তান্তর করেছেন। এই ব্যবস্থার তদন্ত করে শর্ত লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অনিয়মকারী ডিলারদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে উচ্চতর জরিমানা আরোপ এবং প্রয়োজনে বিদ্যমান বিধি সংশোধনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
জবাবে কৃষিমন্ত্রী সার সংকটের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, এখানে কখনো সারের সংকট ছিল না, এখন কোনো সংকট নেই এবং আগামী দিনেও এর কোনো সম্ভাবনা নেই। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় দেশে ৩৫ শতাংশ বেশি সারের মজুত রয়েছে।
তবে মন্ত্রী স্বীকার করেন, কিছু সীমান্তবর্তী এলাকায় ইউরিয়াবহির্ভূত সার, বিশেষ করে ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সারের চাহিদা বেড়েছে। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে দাম বেশি হওয়ায় ডিএপি, টিএসপি ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সারের ক্ষেত্রে আন্তঃসীমান্ত চোরাচালানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, ফলে এসব সারের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি।
মন্ত্রী স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সীমান্ত দিয়ে সারের অবৈধ চলাচল রোধ করার আহ্বান জানান এবং বলেন, বারবার সারের চালান জব্দ করা হয়েছে। তিনি বলেন, যেসব ডিলার সময়মতো বরাদ্দকৃত সার সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হবেন, তাদের খেলাপী হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। দুর্নীতি বা অন্য কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিলারদের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ডিলারশিপ ভাড়া দেওয়া বা হস্তান্তর করা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তিনি নির্দেশ দেন, চলতি মৌসুমে ডিলারদের প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে সারের দোকান খুলতে হবে এবং বিকেল ৫টা থেকে ৬টার আগে দোকান বন্ধ করা যাবে না।
রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. রেজাউল আলম সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম খান, রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবীর, জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামসহ কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, আট জেলার সার ডিলার সমিতির নেতা ও গণমাধ্যমকর্মীরা।




