রংপুর মেডিকেলে ধারণক্ষমতার আড়াই গুণ বিদ্যুৎ লোড, পাঁচ বছরে অন্তত পাঁচবার আগুন

রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে আগুনে পুড়ে কিংবা ছাদের পলেস্তারা ধসে প্রাণ হারানোর আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের। হাসপাতালটির ১ হাজার ২৫০ কেভিএ ক্ষমতার বিদ্যুৎব্যবস্থায় চলছে প্রায় আড়াই গুণ বেশি লোড।
হাসপাতালটি উত্তরাঞ্চলের আট জেলার ২ কোটি মানুষের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র। এর বর্তমান শয্যাসংখ্যা ১ হাজার। তবে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
গণপূর্ত বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের ১ হাজার ২৫০ কেভিএ ক্ষমতার ট্রান্সফরমারের আওতায় শুধু এসি লোডই প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোওয়াট। মেশিন, লাইট, ফ্যানসহ অন্যান্য বিদ্যুচ্চালিত সরঞ্জামের লোড যোগ করলে তা প্রায় ৩ হাজার কিলোওয়াটে দাঁড়ায়। বিদ্যমান ব্যবস্থার ধারণক্ষমতার তুলনায় এই লোড প্রায় আড়াই গুণ।
জরাজীর্ণ বৈদ্যুতিক তার ও অপরিকল্পিত এসি স্থাপনে বাড়ছে অগ্নিঝুঁকি। অন্যদিকে পুরোনো ভবনগুলোর ছাদ ও বিমের পলেস্তারা খসে পড়ছে, বেরিয়ে এসেছে মরিচা ধরা রড। গত পাঁচ বছরে হাসপাতালটিতে অন্তত পাঁচবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তাঝুঁকি কাটেনি। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন গণপূর্ত বিভাগ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে কিছু বৈদ্যুতিক সংযোগ মেরামত করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘হাসপাতালের বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংগুলো অনেক পুরোনো। প্রতিষ্ঠার পর অনেকটা আংশিক মেরামত করা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। বর্তমানে তারগুলো অত্যন্ত জরাজীর্ণ। অনেকগুলো আবার মেরামতের উপযোগী নয়। দ্রুত সেসব পরিবর্তন না করলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
আশিকুর রহমান আরও বলেন, ‘হাসপাতালে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। পুরোনো ওয়্যারিং এবং বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা—এই দুই কারণে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। বৈদ্যুতিক তারগুলো পরিবর্তন করা গেলে শর্টসার্কিটসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।’
গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাসপাতালের অনেক চিকিৎসক ও পরামর্শক নিজ উদ্যোগে এসি স্থাপন করেছেন। এসব এসি স্থাপনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয়নি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, হাসপাতালের বিভিন্ন স্থান থেকে বৈদ্যুতিক কেব্ল ও এসির পাইপ চুরি হয়। মূল কেব্ল চুরি হলে একই মানের কেব্ল সব সময় প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয় না। নিম্নমানের কেব্ল দিয়ে সংযোগ চালু করতে গিয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহে বাধা তৈরি হয়। এতে তার গরম হয়ে শর্টসার্কিটের ঝুঁকি বাড়ে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে আগুন লাগে। এতে বিছানা, এসি ও আসবাব পুড়ে যায়। রোগী ও স্বজনদের সরিয়ে নেওয়ার সময় অনেকে আহত হন। ২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারি হাসপাতালে আরেকটি অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বার্ন ইউনিটের ড্রেসিংরুমের এসির বৈদ্যুতিক অংশে আগুন লাগে। একই বছরের ২৩ জুলাই আইসোলেশন ওয়ার্ডে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
সর্বশেষ গত ২২ অক্টোবর হাসপাতালের প্রশাসনিক শাখার পাশে একটি সুইচবোর্ডে শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগে। প্রাণভয়ে হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়ে অনেক রোগী ও স্বজন আহত হন।
গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য বিভিন্ন অঙ্কের প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে। কোনো কাজের জন্য ৫ কোটি টাকা, কোনো কাজের জন্য দেড় কোটি টাকা এবং অন্য কিছু কাজের জন্য ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার প্রাক্কলন রয়েছে। তাঁর দাবি, চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পাওয়া যায় না। ৩০টি কাজের জন্য অর্থ চাওয়া হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরাদ্দের পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ শতাংশে সীমিত থাকে।
গত সোমবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগী ও স্বজনে হাসপাতাল গিজগিজ করছে, বারান্দা পর্যন্ত পা রাখার জায়গা নেই। বিভিন্ন জায়গায় ছাদ ও বিমের পলেস্তারা খসে পড়েছে। প্রশাসনিক ভবনের সামনের সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতেই দেখা যায়, খসে পড়া ছাদের কংক্রিট সরাচ্ছেন লোকজন। ছাদের মরিচা ধরা রড বেরিয়ে গেছে। নিচে শুয়ে আছেন রোগী ও স্বজনেরা।
বারান্দায় থাকা রোগী পীরগঞ্জের করিমপুরের বাসিন্দা শাহাদত হোসেন বলেন, ‘শুনছি, এই হাসপাতালের বিদ্যুতের লাইনের অবস্থা ভালো না। যখন-তখন আগুন লাগে, আবার ছাদও খসে পড়েছে। এখানে চিকিৎসা নিতে এসে এখন আগুনে পুড়ে কিংবা ছাদের নিচে চাপা পড়ে মারা যাওয়ার ভয় লাগছে।’ কাউনিয়ার মীরবাগ এলাকার রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে বেড নাই। বারান্দায় বসে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। সেটাও নিরাপদ নয়। ছাদ ধসে পড়েছে, অল্পের জন্য মাথায় লাগেনি। এই হাসপাতালে আগুন লাগে, ছাদ খসে পড়ে।’
হাসপাতালের পরিচালক জানান, ২২ অক্টোবরের ঘটনার পর অগ্নিনির্বাপণের জন্য বিভিন্ন স্থানে প্রায় ২৫০টি ফায়ার এক্সটিংগুইশার স্থাপন করা হয়েছে এবং আরও স্থাপন করা হচ্ছে। যেসব স্থানে আগুন লাগার আশঙ্কা বেশি, সেসব স্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। রংপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর (রংপুর-১) নাজমুল হাসান বলেন, ‘রমেক হাসপাতাল অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে।’ এ বিষয়ে কথা বলার জন্য রংপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাকিউল আলমের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।



