রংপুরের গঙ্গাচড়ায় আগুনে চার ঘর পুড়ে ছাই, মারা গেল গরু ও তিন ছাগল, পুড়ল জমানো টাকা ও মেয়ের স্বর্ণ

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের নবনীদাস মাঠের পাড় এলাকায় আগুনে দুই ভাইয়ের চারটি ঘর পুড়ে গেছে। আগুনে একটি গরু ও তিনটি ছাগল মারা গেছে এবং জমি কেনার জন্য জমানো টাকা ও মেয়ের স্বর্ণালংকার পুড়ে গেছে বলে পরিবারটি জানিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যায় গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের ওই এলাকায় অশোক চন্দ্র রায় (৫০) ও তাঁর ছোট ভাই নরেশ চন্দ্র রায়ের বাড়িতে।
পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, সন্ধ্যায় বাড়িতে পূজা-অর্চনা শেষ করে পাশের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন চানু বালা। কিছুক্ষণ পর প্রতিবেশী গোলাপী রানীর চিৎকার শুনে তিনি জানতে পারেন, তাঁদের বাড়িতে আগুন লেগেছে।
ছুটে এসে চানু বালা দেখেন, বসতঘর জ্বলছে। ঘরের ভেতরে বাঁধা গরু ও তিনটি ছাগল ছটফট করছিল, কিন্তু আগুনের তীব্রতায় কাছে যাওয়া সম্ভব হয়নি। চোখের সামনে গবাদিপশুগুলো পুড়ে মারা যায়।
একপর্যায়ে সংসারের সবকিছু পুড়ে যেতে দেখে চানু বালা জ্ঞান হারান বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
আগুনে অশোকদের তিনটি ঘর ও নরেশের একটি ঘর পুড়েছে। পরিবারের দাবি, পুড়ে যাওয়া সম্পদের মধ্যে ছিল জমি কেনার জন্য জমানো তিন লাখ টাকা এবং মেয়ের বিয়েতে দেওয়া প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার। সব মিলিয়ে তাঁদের প্রায় আট লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে পরিবারটি দাবি করেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘরের জায়গায় পোড়া টিন, বাঁশ ও কাঠের অবশিষ্টাংশ পড়ে আছে। বাড়ির পাশে পোড়া টিন দিয়ে তৈরি ছোট একটি চালাঘরে রাত কাটিয়েছেন অশোক ও তাঁর স্ত্রী চানু বালা।
পোড়া বাড়ির উঠানে বসে চানু বালা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, এত ঋণ কীভাবে শোধ করবেন এবং মেয়ের স্বর্ণই-বা কীভাবে দেবেন, সব শেষ হয়ে গেছে, ঘরে কিছুই নেই।
অশোক চন্দ্র রায় এলাকায় ঘুরে নারকেল ও খেজুরগাছের ডাল কাটেন এবং বিভিন্ন বাগানে কীটনাশক প্রয়োগের কাজ করে সংসার চালান। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে তিন-চার বছর আগে, ছেলে জীবিকার জন্য ঢাকায় থাকেন।
অশোক বলেন, বাবার কাছ থেকে পাওয়া মাত্র দুই শতক জমির ওপর কষ্ট করে বাড়ি করেছিলেন তিনি। ছেলের বিয়ের জন্য কিছু জমি কিনে বাড়ি করার আশায় মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর কয়েক বছর ধরে কিস্তি নিয়ে ও কাজ করে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছিলেন। আগুনে সেই সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে কিস্তিতে ৫০ হাজার টাকা তুলেছিলেন, সেখানেও এখন ৩০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে।
মেয়ের বিয়ের সময় ধারদেনা করে প্রায় দুই লাখ টাকার স্বর্ণালংকার দিয়েছিলেন অশোক। মেয়ের সন্তান হওয়ার সময় সেই স্বর্ণ মায়ের কাছে রেখে গিয়েছিলেন মেয়ে, আগুনে সেগুলোও পুড়ে গেছে বলে তিনি জানান।
প্রত্যক্ষদর্শী গোলাপী রানী বলেন, সন্ধ্যায় পূজাপাঠ শেষ করে বাইরে বেরিয়ে তিনি দেখেন ঘরের টিনের চাল দিয়ে আগুন বের হচ্ছে। তাঁর চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু আগুন নেভানো যায়নি। পাশে দেয়াল থাকায় গরু-ছাগল থাকা ঘরে ঢোকাও সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিস আসার পর আগুন নিভলেও ততক্ষণে সব শেষ হয়ে যায় বলে তিনি জানান।
স্থানীয় লোকজন আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। খবর পেয়ে গঙ্গাচড়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে সরু ও চলাচলের অনুপযোগী রাস্তার কারণে তাঁদের পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে এবং ততক্ষণে বসতঘর ও মালামালের বেশির ভাগ পুড়ে যায়।
পরিবারের ধারণা, বাড়ির পূজার ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গঙ্গাচড়া ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটার আরিফুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এতে প্রায় চার লাখ ৫০ হাজার টাকার মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের পৌঁছানোর আগে প্রায় দুই লাখ ৭০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানান।
রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী বলেন, রাতেই তিনি আগুন লাগার খবর শুনেছেন। বৃহস্পতিবার তিনি ঘটনাস্থলে যাবেন এবং পরিবারটির জন্য কিছু করা যায় কি না দেখবেন বলে জানান।




