পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি দ্রুত ঘোষণা করে জানুয়ারি থেকে কার্যকরের দাবি জামায়াতের, তোলা হলো ১২ দাবি
তৈরি পোশাকশিল্পে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করে আগামী জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পারওয়ার। শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে এই মজুরি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পোশাকশিল্পের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল এ আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রতি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ১২ দফা দাবি উপস্থাপন করেন তিনি।
গোলাম পারওয়ার বলেন, সরকার গত ১ নভেম্বর ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। গতকাল ৪ নভেম্বর বোর্ডের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই বোর্ড শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বর্তমান বাজারদর, পরিবারের সদস্য সংখ্যা এবং মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ প্রদান করবে।
তিনি বলেন, পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছেন। বর্তমানে শ্রমিকেরা অত্যন্ত কঠিন জীবনযাপন করছেন বলে তিনি জানান।
গোলাম পারওয়ার বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় শ্রমিকদের আয় ও জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। একজন শ্রমিকের মাসিক আয়ে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শ্রমিকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তার শ্রমের ন্যায্য অধিকার। শ্রমিকের শ্রম ও উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে যে শিল্প ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, সেই শ্রমিকের জীবনমান উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
পোশাকশিল্পের চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, একের পর এক কারখানা বন্ধ এবং লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল শ্রমিক-মালিক বিরোধের বিষয় নয়; এটি দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট।
একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা, লুটপাট এবং উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত করার মতো কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান তিনি। চলমান শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগসহ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠী উসকানি ও নাশকতার চেষ্টা করছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করার ওপর জোর দেন তিনি। তবে কোনো প্রমাণ ছাড়া সাধারণ শ্রমিকদের দায়ী করা যাবে না বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনকে দমন করার নামে হয়রানি, নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তারের পথ পরিহার করতে হবে।
১২ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
দাবিগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নাশকতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করা; এবং চলমান শ্রম অসন্তোষের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি ও হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহার করা।
এছাড়া রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করা; শ্রমিক, কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা; এবং পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিসহ খাতের অংশীজনদের নিয়ে অবিলম্বে কার্যকর সংলাপের আয়োজন করার দাবি জানানো হয়।
দাবির তালিকায় বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত খুলে দেওয়ার উদ্যোগ ও শ্রমিকদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা; অন্যায় ও বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করা, কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাঁদের পুনরায় কাজের সুযোগ দেওয়া এবং শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইম ও অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধের কথাও রয়েছে।
গোলাম পারওয়ার আরও দাবি করেন, পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের দাবি জানান তিনি।
নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও তোলা হয়। দেশের পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।



