ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে সরকারি খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মাণ, জলাবদ্ধতার আশঙ্কা স্থানীয়দের

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় পুরাতন সরকারি খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি কাগজপত্রে জায়গাটি সরকারি খাল হিসেবে উল্লেখ থাকলেও সেখানে ড্রেন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কালীগঞ্জ পৌরসভা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মাণের ফলে বর্ষাকালে পানির প্রবাহ কমে গিয়ে শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে।
জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে কোভিড-১৯ প্রকল্পের অধীনে সরকারি খালের ওপর ১৬৫ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৮ ফুট প্রস্থের ড্রেন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করে কালীগঞ্জ পৌরসভা। এই ড্রেন নির্মাণে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
কাজটির ঠিকাদার বাংলাদেশ ট্রেডিং অ্যান্ড করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম। স্থানীয়ভাবে কাজটি দেখাশোনা করছেন উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব মাহাবুবুর রহমান মিলন।
অন্যদিকে, একই খাল খননের জন্য ২০২৬ সালের ১ মার্চ ঝিনাইদহ স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক বরাবর কালীগঞ্জ পৌরসভার প্যাডে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে স্বাক্ষর করেন কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক রেজওয়ানা নাহিদ।
সরেজমিনে বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সরকারি খালের মধ্যে শ্রমিকরা কাজ করছেন এবং সেখানে ড্রেন নির্মাণের জন্য ঢালাইয়ের কাজ চলছিল।
পৌর ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কালীগঞ্জ পৌরসভার নিশ্চিন্তপুর মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানের ২৫৫২ ও ২৬০১ নম্বর দাগে সরকারি খাল উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ২৬০১ নম্বর দাগের সরকারি খালে ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। নিশ্চিন্তপুর মৌজার সরকারি মানচিত্রেও ওই স্থানটি খাল হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে, যেখানে সরকারি খালের নামে সাড়ে ৩২ শতক জমি রয়েছে।
খালটির প্রস্থ অনেক জায়গায় ১৫ থেকে ২০ ফুট ছিল। সেখানে এখন ৮ ফুট প্রস্থের ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী খাল খননের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। কিন্তু কালীগঞ্জে খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই খাল দিয়ে বর্ষার সময় চিত্রা নদীতে কয়েকটি গ্রামের পানি প্রবাহিত হয়। ড্রেন নির্মাণ করা হলে জলাবদ্ধতা বাড়বে, বর্ষাকালে খালে পানির চাপ বাড়লে ড্রেনটি কোনো কাজেই আসবে না এবং সরকারের প্রকল্পের অর্থ পানিতে যাবে বলে তাদের অভিযোগ।
কালীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক কমিশনার মুক্তার হোসেন বলেন, কালীগঞ্জ শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে এই খালটির অবদান অনেক। এই খাল দিয়ে পৌরসভার কয়েকটি গ্রাম ছাড়াও উপজেলার পশ্চিমের শিমলা-রোকনপুর ও ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নের প্রায় ২৭টি গ্রামের পানি শহরের ভেতর দিয়ে চিত্রা নদীতে যায়। এই খালে ড্রেন নির্মাণ করা হলে কয়েকটি গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খাল খনন করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যাচ্ছেন। কিন্তু কালীগঞ্জে পৌরসভার উদাসীনতায় খাল ভরাট করে ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ট্রেডিং অ্যান্ড করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম মুঠোফোনে জানান, তার লাইসেন্সে জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম পিন্টু কাজটি করছেন। পিন্টু সম্পর্কে তার জামাতা। এরপর তিনি পিন্টুর সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
স্থানীয়ভাবে কাজের দেখভালের দায়িত্বে থাকা উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব মাহাবুবুর রহমান মিলন বলেন, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম পিন্টুর শ্বশুরের লাইসেন্সে এই কাজ করা হচ্ছে। খালের বিষয়ে ঝামেলা হয়েছিল। কাজ শুরুর আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দুই গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রকৌশলী কবির হাসান বলেন, যেখানে ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটি জনসাধারণের জায়গা। এলাকাবাসীর সঙ্গে বসে আলোচনা ও রেজল্যুশনের মাধ্যমে ড্রেন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কালীগঞ্জ পৌরসভার পৌর নায়েব খোকন কুমার দাস বলেন, সরকারি নথিতে জায়গাটি খাল হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে। ২৫৫২ ও ২৬০১ নম্বর দাগে সাড়ে ৩২ শতক জমি সরকারি খাল হিসেবে রেকর্ড করা আছে।
কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে। পৌরসভার সার্ভেয়ার জানিয়েছেন, খালের জায়গা রাস্তার মধ্যে চলে গেছে। এখন যে ড্রেন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটি জনসাধারণের জায়গায়। সংসদ সদস্য, স্থানীয় জনগণ ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি সবাই এসে আলোচনা করে এই ড্রেন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খাল খননের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন।




