…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › আন্তর্জাতিক › খবর
আন্তর্জাতিক

শীতের মুখে গাজার সৈকতের তাঁবুতে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো, রান্নার হাঁড়ির বাঁধে ঢেউ ঠেকানোর চেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক

গাজার উপকূলে খান ইউনিসের আল-কারারা বন্দরের কাছে সমুদ্র থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে একটি জীর্ণ তাঁবুতে ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে থাকেন ৩৩ বছর বয়সী আনাস আল-শামি। শীত ঘনিয়ে আসায় সেই তাঁবু বাতাস ও বৃষ্টি থেকে প্রায় কোনো সুরক্ষাই দিতে পারছে না; স্যাঁতসেঁতে ভাব প্রতি মুহূর্তে তাঁদের বিছানা ও জিনিসপত্র ভিজিয়ে দিচ্ছে, আর সমুদ্রের ফুলে ওঠা ঢেউও হয়ে উঠেছে প্রতিনিয়ত হুমকি।

সৈকতটি আল-শামির নিজের পছন্দে বেছে নেওয়া থাকার জায়গা ছিল না। ঘর ছেড়ে পালিয়ে যে আশ্রয়ে তাঁর পরিবার ঠাঁই নিয়েছিল, সেটি দ্রুতই অতিরিক্ত ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায়। এই তাঁবুর চেয়ে নিরাপদ কোনো জায়গার খরচ জোগানোর সামর্থ্য তাঁদের নেই।

আল-শামি ও তাঁর পরিবারকে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের পূর্বে অবস্থিত বানি সুহেইলা ছাড়তে বাধ্য হতে হয়েছিল। এলাকাটি ইসরায়েলের তথাকথিত ‘ইয়েলো জোন’-এর অংশ হয়ে গেছে, যার ওপারে ফিলিস্তিনিদের যাওয়ার অনুমতি নেই।

আল-শামি বলেন, ‘বাস্তুচ্যুত এলাকাগুলোতে তাঁবু খাটানোর মতো জমি খুঁজেছি, কিন্তু অতিরিক্ত ভিড় আর ভাড়ার উচ্চ খরচের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তাই পরিবারসহ আমার ওপর যে বিপদ রয়েছে, তা জেনেও সৈকতেই থাকতে বাধ্য হয়েছি।’

গত শীতের স্মৃতি এখনো তাঁকে তাড়া করে। সমুদ্রের পানি ও বৃষ্টি তাঁদের তাঁবু প্লাবিত করেছিল ঘুমের মধ্যেই; ঘুম ভেঙে তিনি দেখতেন, তাঁর সন্তানেরা পানিতে শুয়ে আছে। তাঁদের বিছানা ও জিনিসপত্র বারবার ভিজে যেত, আর তাঁবুটি পুকুরে পরিণত হলে তিনি সন্তানদের ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে পারতেন না।

সারা বছর চেষ্টা করেও পরিবারটি অন্যত্র যাওয়ার কোনো জায়গা পায়নি। ফলে সৈকতেই আরেকটি শীত কাটানোর মুখে পড়েছে তারা। আল-শামি বলেন, পানি, ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের বারবার সংস্পর্শে তাঁর সন্তানদের গুরুতর অসুস্থতা হয়েছে, যা তাদের জীবনের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

উপকূলের এই অংশজুড়ে একই গল্প অনেক পরিবারের। পূর্ব খান ইউনিস থেকে বাস্তুচ্যুত ৪৭ বছর বয়সী ইব্রাহিম আবু তাইর বন্দরের তীরে একটি সংকীর্ণ তাঁবুতে থাকছেন তাঁর সাত সন্তানকে নিয়ে। জীর্ণ সেই আশ্রয়ে মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসের কোনোটিই নেই, আর ঠান্ডা, বৃষ্টি ও বাতাস থেকে সুরক্ষাও প্রায় নেই বললেই চলে।

আবু তাইর বলেন, ‘সন্তানদের সামনে অসহায় বোধ করাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে তাদের শীতের কাপড় দিতে পারি না, ঘুমানোর জন্য একটা শুকনো তোশকও দিতে পারি না।’ প্রবল বাতাস আর ঢেউয়ের শব্দে রাতে তাঁর ঘুম আসে না। গত বছরের মতো আবার বন্যায় তাঁবু ভেসে গিয়ে পরিবারকে খোলা আকাশের নিচে ঠান্ডায় কাটাতে হবে—এই আতঙ্ক তাঁকে তাড়া করে। তাঁর সবচেয়ে বড় ইচ্ছা, এমন একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাওয়া, যেখানে তাঁর সন্তানেরা ভয় ছাড়া ঘুমাতে পারবে।

কিছু পরিবার পানি ঠেকাতে একটি অস্থায়ী উপায় বের করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত রান্নার হাঁড়িতে মাটি ভরে তারা তাঁবুর পাশে সমুদ্রের পানির বিরুদ্ধে একটি বাঁধ তৈরি করেছে।

ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সহযোগিতায় কাজ করা ত্রাণ সংস্থা মায়াসেম অ্যাসোসিয়েশন এই উদ্ভাবনী উপায়টি গ্রহণ করেছে এবং এখন আল-কারারা বন্দরের কাছের এই এলাকার পরিবারগুলোর জন্য এ ধরনের হাঁড়ির বাঁধ তৈরি করছে। উদ্যোগটিতে বারবার আগুনের সংস্পর্শ, ক্ষয় ও ছিদ্রের কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়া বড় হাঁড়ি পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের দান করা তিনটি হাঁড়িতে মাটি ভরে একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে প্রায় ১৫০ সেন্টিমিটার উঁচু বাঁধ তৈরি করা হচ্ছে, যা ধেয়ে আসা পানি আটকে রেখে ঢেউকে আশ্রয়স্থল পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধা দেয়।

সংস্থাটির জরুরি সাড়া সমন্বয়ক খলিল আবু লাহিয়া বলেন, ‘উদ্যোগটি প্রথমে সংস্থার নিরাপদ স্থানকে রক্ষা করার জন্য বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, যেখানে শিক্ষা কার্যক্রম, স্কুল, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিল্প ও ঐতিহ্য বিষয়ক কর্মসূচি পরিচালিত হয়। পরে ধারণাটি উপকূলজুড়ে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর তাঁবু রক্ষার চেষ্টায় রূপ নেয়।’

তবে এই উদ্ভাবনী চিন্তা ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা কেবল একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা, যা নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যাপক ঘাটতি পূরণ করতে পারে না। গাজার শীতকালীন জরুরি কমিটি একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা দেওয়ার মধ্যেই এই উদ্যোগ এসেছে; তাঁবু ও ক্যারাভানের সংকট এখনো চরমে রয়েছে, কারণ ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজা উপত্যকায় সেগুলোর প্রবেশের পাশাপাশি জরুরি নির্মাণসামগ্রী ও জ্বালানি সরবরাহও আটকে রেখেছে বলে কমিটি জানিয়েছে।

কমিটি জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী পৌরসভাগুলোর প্রয়োজনীয় পরিচালন সরঞ্জামের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীর উদ্ধার সরঞ্জামের ৯০ শতাংশ ধ্বংস করেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে যন্ত্রপাতি ও জেনারেটর শিগগিরই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে, যার ফলে বন্যা মোকাবিলা, উদ্ধার অভিযান ও রাস্তা পরিষ্কারের সক্ষমতা আরও কমে যাবে। সব মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ জীর্ণ তাঁবুতে শিশু, নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। কমিটির সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজার ৮০০টি তাঁবু রয়েছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়—শুকনো নদীখাতে, যা এখন প্লাবিত হতে পারে, বৃষ্টির পানি জমার পুকুরে এবং শীতের ঢেউয়ের মুখে থাকা সৈকতে। এগুলো জরুরিভাবে নিরাপদ স্থানে সরানো প্রয়োজন। ফাটল ধরা প্রায় ২ হাজার ভবনও ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে, যেগুলোতে পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে। কমিটি বলছে, নির্মাণসামগ্রী, ক্যারাভান, আশ্রয় ও জ্বালানি—সবই জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক বিভাগের আরও খবর

আন্তর্জাতিক

‘টেড টক বাদ দিন, বসকে গিয়ে বলুন’—মধ্যবর্তী হারের বিশ্লেষণ নিয়ে ভ্যান্সকে খোঁচা ইরানের স্পিকারের

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির কারণ বিশ্লেষণ করে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দীর্ঘ সামাজিকমাধ্যম-বার্তা নিয়ে এবার বিদ্রূপ করে…

আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় অক্টোবরে রাশিয়ার তেল-গ্যাস আয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ১১.৯ বিলিয়ন ডলার

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া ও বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে গত অক্টোবরে রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস খা…

আন্তর্জাতিক

রাশিয়া-ইউক্রেনের পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলা: খারকিভের ডাককেন্দ্র ও জাহাজে রুশ হামলা, রিয়াজানের শোধনাগারে আগুন

রাশিয়া ও ইউক্রেন পরস্পরের অবকাঠামোতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যাতে দুই পক্ষেই হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। মস্কো বৃহস্পতিবার বলেছে, তারা একটি ডাক লজিস্টিকস…

গাজায় তাঁবুতে বিদ্যুতের জন্য নিজের হাতে বায়ুকল বানালেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি
আন্তর্জাতিক

গাজায় তাঁবুতে বিদ্যুতের জন্য নিজের হাতে বায়ুকল বানালেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি

গাজার খান ইউনিসের কাছে আল-মাওয়াসিতে বাস্তুচ্যুত শিবিরের তাঁবুগুলোর ওপরে ঘরে তৈরি বায়ুকল সমুদ্রের বাতাসে ঘুরছে, বিদ্যুৎহীন পরিবারগুলোর জন্য যা এক ধরন…