রাশিয়ার ‘ছায়া বহর’-এর জাহাজ চালানোর অভিযোগে ব্রিটেনে বন্দি ভারতীয় ক্যাপ্টেন অজয় পান্ত, নাবিকদের মধ্যে ক্ষোভ
রাশিয়ার ওপর যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অভিযোগে ব্রিটেনে আটক রয়েছেন ভারতীয় বাণিজ্যিক নৌ-কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন অজয় পান্ত। আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা অবস্থায় ব্রিটিশ সৈন্যরা তার জাহাজ এমটি স্মিরতোস দখলে নেওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়; প্রথম এ ধরনের এই মামলা বিশ্বজুড়ে নাবিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
অজয় পান্তের স্ত্রী রিতু পান্ত ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য উত্তরাখণ্ডে থাকেন। তিনি বলেন, কোনো অভিযানে বের হওয়ার আগে তিনি সবসময় নিশ্চিত করতেন, স্বামী তাকে দুটি তথ্য জানিয়েছেন — জাহাজের নাম ও জরুরি যোগাযোগের বিবরণ।
গত ২৫ এপ্রিলও তাই হয়েছিল; সেদিন অজয় ওডিশা রাজ্যের পারাদীপ বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকার এমটি স্মিরতোসে রওনা হন। অজয় ১৮ বছর ধরে নাবিক, বছরে ছয়-সাত মাস সমুদ্রে কাটান।
কিন্তু জাহাজটি ধরা পড়ার খবর রিতু জুনের মাঝামাঝি জানতে পারেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট থেকে। জলদস্যুরা নয়, জাহাজটি আটক করেছিল ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনী। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এমটি স্মিরতোসের বিরুদ্ধে অভিযোগ, এটি রাশিয়ার ‘ছায়া বহর’-এর অংশ হিসেবে কাজ করেছে — যে জাহাজ-নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মস্কো ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ এড়িয়ে তেল-গ্যাস বিক্রি চালিয়ে যায়।
এখন অজয়ের বিরুদ্ধে জাহাজটির নেতৃত্ব দিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। জানা মতে, কোনো ইউরোপীয় দেশ এ ধরনের অভিযোগে কোনো জাহাজের ক্যাপ্টেনকে আটক রাখার ঘটনা এটাই প্রথম; আইনজীবী ও নাবিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, এটি উদ্বেগজনক নজির তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের (আইটিএফ) যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি টনি প্যাটেন বলেন, ‘এটি একটি অনন্য মামলা।’
অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোও রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের অভিযোগে জাহাজ দখল করেছে, কিন্তু জাহাজ রেখে দিয়ে নাবিকদের ছেড়ে দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চে সন্দেহভাজন রাশিয়ান ছায়া বহরের এক ক্যাপ্টেনের বিচার হয় ফরাসি আদালতে তার অনুপস্থিতিতে। ফিনল্যান্ডের একটি আদালত এখতিয়ারের অভাবের কথা বলে বাল্টিক সাগরে সমুদ্রতলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে অভিযুক্ত এক রাশিয়ান তেল ট্যাংকারের ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ খারিজ করে দেয়। অন্য ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো জরিমানা করে বাণিজ্যিক নাবিকদের ছেড়ে দিয়েছে। অজয় দোষী সাব্যস্ত হলে তার সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।
গত ১৪ জুন এমটি স্মিরতোস ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে যাওয়ার সময় রয়্যাল মেরিনস কমান্ডোরা জাহাজটিকে আটক করে; তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের অনুমোদনে এ ধরনের অভিযান ছিল প্রথম। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে মেরিটাইম এয়ার গ্রুপের চিনুক, মার্লিন এমকে৪ ও ওয়াইল্ডক্যাট হেলিকপ্টার, রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি পি-৮এ পোসাইডন সামুদ্রিক টহল বিমান, একটি ফ্রিগেট ও একটি মাইন প্রতিরোধী জাহাজ অংশ নেয়। সে সময় জাহাজটি আন্তর্জাতিক জলসীমায়, যুক্তরাজ্যের আঞ্চলিক এখতিয়ারের বাইরে ছিল।
জাহাজটি রাশিয়া থেকে তেল বহন করছিল এবং সুয়েজ খাল হয়ে ভারতের দিকে যাওয়ার পথে ছিল। স্টারমার এক্স-এ পোস্ট করে বলেন, ‘এই সফল অভিযান রাশিয়ার জন্য আরেকটি আঘাত এবং ইউক্রেনে পুতিনের যুদ্ধে যারা জ্বালানি জোগাচ্ছে, তাদের মনে করিয়ে দেয় — আমরা তাদের লুকিয়ে থাকতে দেব না।’
এরপর অভিযোগ আনা হয় অজয়ের বিরুদ্ধে; তখন থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে আটক রয়েছেন। প্রাথমিক আদালত শুনানির পর তার জামিন নামঞ্জুর হয়।
নাবিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে জাতিসংঘ-স্বীকৃত অলাভজনক সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাট সি’-র প্রতিষ্ঠাতা আইনজীবী ডেভিড হ্যামন্ড বলেন, স্মিরতোস মামলাটি ‘খুবই অনন্য’, কারণ জাতিসংঘের অনুমোদনহীন নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক জলসীমায় কীভাবে প্রয়োগ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার বোঝামতে, আন্তর্জাতিক ট্রানজিট করিডর হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে যাওয়া একটি নিষিদ্ধ জাহাজকে এভাবে আটকানো আগে ঘটেনি।’
হ্যামন্ড বলেন, মামলাটির ফলাফল নির্ধারণ করবে উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কীভাবে কার্যকর করবে; পাশাপাশি এটি ‘নাবিকদের অপরাধী বানানোর’ ঝুঁকিও তুলে ধরে। তার ভাষায়, ‘স্মিরতোসের ক্ষেত্রে যুক্তি দেওয়া যায়, ক্যাপ্টেন পান্তকে শুধু তার কাজ করার জন্যই অপরাধী বানানো হচ্ছে।’ আইটিএফের প্যাটেনও বলেন, ‘আমাদের অবস্থান হলো, এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই নাবিকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাস্তি দেওয়া ন্যায্য নয়।’
আল জাজিরাকে দেওয়া বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) নিশ্চিত করেছে, চলতি বছর বিভিন্ন সংঘাতে অন্তত ৬৬ জন নাবিক নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন, অনেকে এখনো নিখোঁজ। প্যাটেন বলেন, ‘সমুদ্রে থাকা মানুষদের জন্য এটি একটি ভয়াবহ বছর গেছে।’




