ইউরোপজুড়ে বিমানে বোমা হুমকির ঢেউ, তল্লাশিতে মেলেনি বিস্ফোরক
ইউরোপজুড়ে বিমানে বোমা হামলার হুমকির ঢেউয়ের মুখে ফ্লাইট ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, মাটিতে আটকে রাখা হয়েছে এবং যুদ্ধবিমানের পাহারায় নেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ভুয়া সতর্কতার দ্বিতীয় বড় ঢেউ। নিরাপত্তা তল্লাশিতে কোনো বিস্ফোরকের প্রমাণ মেলেনি।
বৃহস্পতিবার আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, স্পেন ও ডেনমার্কসহ ১৬টি দেশ থেকে ছাড়া বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফ্লাইটগুলোকে হয় বিকল্প গন্তব্যে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, নয়তো অতিরিক্ত নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। শুক্রবারও হুমকি অব্যাহত ছিল।
বেশ কয়েকটি দেশে কর্তৃপক্ষ বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ও সামরিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। হুমকির পর নিরাপত্তা তল্লাশিতে এখন পর্যন্ত বিমানে বিস্ফোরক বা সন্দেহজনক কোনো উপাদানের প্রমাণ মেলেনি এবং কোনো যাত্রী আহত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়নি।
শুক্রবার ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ফোনে বোমা হুমকি দেওয়ার পর রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইট সকাল ৮টায় পর্তুগালের লিসবনে অবতরণ করে। বিমানটি অবতরণের সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়। আলাদাভাবে, ইতালির ফিউমিচিনোর নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার প্যারিস থেকে রোমগামী উইজএয়ারের একটি ফ্লাইটে বিস্ফোরক থাকার সতর্কতা পায়। ওই ফ্লাইটটিকে ভেনিসে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে পুলিশ বিমানের আশপাশের এলাকা খালি করছিল।
ব্রিটিশ এয়ারলাইন পাইলটস অ্যাসোসিয়েশন বালপার ফ্লাইট নিরাপত্তা, নীতি ও বিধি পরিচালক জোজি ওয়েইটস বলেন, কোনো বিমান সংস্থা বিমানে হুমকির খবর পেলে তা মূল্যায়নকারীদের একটি দলের কাছে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, ‘এই মূল্যায়নকারীরা প্রমিত প্রক্রিয়া ব্যবহার করে হুমকির মাত্রা নির্ধারণ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন হুমকিটি লাল (বিশ্বাসযোগ্য), অ্যাম্বার (আংশিক বিশ্বাসযোগ্য) নাকি সবুজ (বিশ্বাসযোগ্য নয়)। বিমান আকাশে থাকলে অ্যাম্বার মূল্যায়ন উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয় না।’
এক বিমানবন্দর কর্মকর্তা জানান, হুমকি পাওয়ার পর বিমানটিকে বিমানবন্দর ভবন থেকে অনেক দূরের একটি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। যাত্রীদের নামিয়ে তল্লাশি করা হয়, যখন সীমান্ত পুলিশ ঘ্রাণশক্তিসম্পন্ন কুকুর দিয়ে বিমানটি পরীক্ষা করে।
এই ঘটনাগুলোর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতেও ধারাবাহিক ভুয়া বোমা হুমকি এসেছিল। সোমবার যুক্তরাজ্য থেকে বুলগেরিয়াগামী একটি ফ্লাইট একটি হুমকির পর ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, যা পরে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। মঙ্গলবার ক্ষতিকর ভুয়া বোমা সতর্কতার কারণে ইউরোপজুড়ে সাতটি বিমান তল্লাশি করা হয় বা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
কভেন্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিমান নিরাপত্তা বিষয়ক ভিজিটিং অধ্যাপক ফিলিপ বম বলেন, সর্বশেষ ঘটনাগুলোর মাত্রা ও সমন্বিত ধরন অস্বাভাবিক। তিনি বলেন, প্রতিদিনই কোনো না কোনো বিমান সংস্থা বোমা হুমকি পায়, কিন্তু অধিকাংশই খুব দ্রুত মূল্যায়ন করে অনির্দিষ্ট বলে নির্ধারণ করা হয় এবং বিমানগুলো ঘুরিয়ে দেওয়া হয় না।
বমের মতে, সর্বশেষ ঘটনাগুলোকে যা আলাদা করেছে তা হলো ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের কর্তৃপক্ষ হুমকিগুলোকে বিমান অবতরণ করিয়ে নিরাপত্তা তল্লাশি করার মতো বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি ফ্লাইট বিঘ্নে বিমান সংস্থাগুলোর ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
যুক্তরাজ্য সরকার সর্বশেষ এই বিঘ্নকে ‘ক্ষতিকর ভুয়া হুমকি’ বলে অভিহিত করেছে। যাত্রী পরিবহনে ইউরোপের ব্যস্ততম বিমানবন্দর লন্ডন হিথ্রোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
ইউরোপীয় পরিবহন কমিশনার বলেছেন, এই হামলাগুলোর পেছনে কারা রয়েছে বা ঘটনাগুলো আদৌ পরস্পর সংযুক্ত কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি। ইউরোপীয় সরকারগুলো এখন পর্যন্ত কাউকে দায়ী করা থেকে বিরত রয়েছে।
তবে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়া দেশগুলো হাইব্রিড হামলা নিয়ে সতর্ক রয়েছে। জার্মানি লাইপজিগ-হালে বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক ড্রোন অনুপ্রবেশের জন্য সরাসরি রাশিয়াকে দায়ী করেছে; মস্কো সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউরোপে বিমান চলাচলে হুমকিতে রাশিয়া, ইরান বা তাদের সঙ্গে যুক্ত কোনো প্রক্সি গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ নেই এবং মস্কো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।

