মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসে নেতৃত্বের লড়াই: শুমার-জেফরিসের বিরুদ্ধে নিজ দলেই চাপ, শীর্ষ রিপাবলিকান পদে স্কালিস-জর্ডান

মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এখন আরও তুমুল লড়াই চলছে—দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে।
প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন (রিপাবলিকান, লুইজিয়ানা) সংখ্যালঘু দলের নেতার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা জন থুনের (রিপাবলিকান, সাউথ ডাকোটা) সঙ্গে সব সময় একমত হন না, তবে সেখানে পরিবর্তনের দাবি তিনি তোলেননি।
অন্যদিকে মঙ্গলবার রাতের চমকপ্রদ ডেমোক্র্যাটিক জয় সত্ত্বেও নবনির্বাচিত কয়েকজন প্রগতিশীল সদস্য প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু দলের নেতা হাকিম জেফরিস (ডেমোক্র্যাট, নিউইয়র্ক) ও সিনেটের সংখ্যালঘু দলের নেতা চাক শুমারকে (ডেমোক্র্যাট, নিউইয়র্ক) নিয়ে নিজেদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন।
মিশিগানের সিনেটর-নির্বাচিত আবদুল এল-সাইদ (ডেমোক্র্যাট) দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, তিনি শুমারকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে সমর্থন নাও করতে পারেন। গত জুনের শেষ দিকে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি যদি চাক শুমার হন, আমি আপনার জন্য বিপজ্জনক।’ নির্বাচনের পরপরই এনবিসিতে শুমারকে সমর্থনের প্রশ্নটি তিনি এড়িয়ে যান। তাঁর ভাষায়, ‘আমি সেই বিকল্পকেই ভোট দেব, যা আমাকে রাজনীতি থেকে অর্থ বের করে দেওয়ার, মানুষের পকেটে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার এবং সবার জন্য মেডিকেয়ার পাস করার সেরা সুযোগ দেবে।’
বৃহস্পতিবার সিএনএনে এল-সাইদ আবারও সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেনের (ডেমোক্র্যাট, মেরিল্যান্ড) প্রতি নিজের সমর্থনের কথা জানান, যদিও ভ্যান হলেন কোনো পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেননি। এল-সাইদ বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি চমৎকার একজন সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হবেন।’
অন্য নবাগতরাও শুমারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হননি। কানসাসের সিনেটর-নির্বাচিত অ্যাডাম হ্যামিল্টন (ডেমোক্র্যাট) নির্বাচনের আগে ফক্সকে বলেছিলেন, ‘না, আমি (শুমারকে) সমর্থন করব না। আমি আগেই বলেছি, আমি (তাঁকে) ভোট দেব না।’ সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর-নির্বাচিত অ্যানি অ্যান্ড্রুজ (ডেমোক্র্যাট) সহকর্মী ব্রেট বেয়ারকে বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, এটা সত্যিই স্পষ্ট যে দুই দলই নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত।’ মেইনের সিনেটর-নির্বাচিত ট্রয় জ্যাকসন (ডেমোক্র্যাট) বলেছেন, ‘আমি সিনেটর শুমারকে বলেছি, আমি অন্য কাউকে সমর্থন করব।’
বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শুমার বলেন, ‘আমি আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হব। তবে বিষয়টি হলো আমেরিকার জনগণ ও তারা কী চায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া।’ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হতে গোপন ককাস ভোটে শুমারের প্রয়োজন নিজের সদস্যদের মধ্যে প্রায় ২৯ জনের সমর্থন, যা আগামী বছর দায়িত্ব পালন করবেন এমন প্রত্যাশিত সিনেট ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার অন্তত পাঁচজন সদস্য জেফরিসকে সমর্থন আটকে রাখার অঙ্গীকার করেছেন, যদি না তিনি নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন। জেফরিস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হতে চলেছেন। স্পিকার হতে হলে পুরো হাউসের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার—৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেস বসলে সব প্রতিনিধি-নির্বাচিত ভোট দিলে ৪৩৫টির মধ্যে ২১৮ ভোট। সব আসনের ফল নির্ধারিত হলে হাউস ডেমোক্র্যাটরা ২৬০টির বেশি আসন পেতে পারেন, ফলে তিনি কয়েক ডজন সদস্যের বিরোধিতা সত্ত্বেও টিকে যেতে পারবেন।
রিপাবলিকান শিবিরে জনসন গত মাসেই সহকর্মী আয়শা হাসনিকে দেওয়া বক্তব্যে নিজের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর যদি আমাদের হৃদয়ে এমন ভাবনা দেন যে আমাদের নিজ শহর শ্রেভপোর্টে ফিরে গিয়ে লন বা ঘাস কাটার ব্যবসা শুরু করা উচিত, আমি তাই করব।’
হাউসের শীর্ষ রিপাবলিকান হতে লড়ছেন হাউসের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা স্টিভ স্কালিস (রিপাবলিকান, লুইজিয়ানা) ও প্রতিনিধি জিম জর্ডান (রিপাবলিকান, ওহাইও)। হাউসের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হুইপ টম এমার (রিপাবলিকান, মিনেসোটা) সংখ্যালঘু দলের হুইপ হিসেবে ফিরতে চান; তাঁকে চ্যালেঞ্জ করছেন প্রতিনিধি অগাস্ট ফ্লুগার (রিপাবলিকান, টেক্সাস)।
ডেমোক্র্যাটরা প্রচারে দুটি বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন: জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনা। ইলিনয়ের সিনেটর-নির্বাচিত জুলিয়ানা স্ট্র্যাটন (ডেমোক্র্যাট) সিএনএনকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘আমাদের প্রথমে সেখানে গিয়ে সত্যিই মনোযোগ দিতে হবে ওই এক বড় কুৎসিত বিলের কাটছাঁটগুলো ফিরিয়ে আনার দিকে।’ মেয়াদোত্তীর্ণ ওবামাকেয়ার ভর্তুকি নবায়নের ওপরও ভোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; বাড়তে থাকা প্রিমিয়ামের ব্যয় মেটাতে অর্থের দাবিতেই ডেমোক্র্যাটরা সরকারি তহবিলের ভোটের বিনিময়ে অবস্থান নিয়েছিলেন, হাউস শেষ পর্যন্ত সেই বিল পাস করলেও সিনেট করেনি, আর ওই অচলাবস্থাই ছিল গত বছরের রেকর্ড ৪৩ দিনের সরকারি বন্ধের মূল উপাদান। শুমার বলেছেন, ‘বন্ধের ঘটনা এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দল দুটির মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে আমেরিকার জনগণের ধারণাকে আরও তীক্ষ্ণ করেছে।’
ডেমোক্র্যাটরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডেটা সেন্টারের ভবিষ্যৎ—নিয়েও উদ্বিগ্ন। প্রগতিশীল ককাসের চেয়ারম্যান প্রতিনিধি গ্রেগ কাসার (ডেমোক্র্যাট, টেক্সাস) বলেছেন, ‘ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ একটি বড় এআই ভূমিকম্পের প্রাথমিক কম্পন মাত্র, যা মার্কিন রাজনীতিকে উলটপালট করে দিচ্ছে। আর এই ইস্যুতে আমাদের সঠিক পক্ষে থাকতে হবে।’
ইরান যুদ্ধ শেষ করার ওপরও ভোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—সম্ভবত ওই অভিযানের জন্য অর্থ বন্ধ করে দিয়ে। হাউস তিনটি ‘ওয়ার পাওয়ার্স’ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে, সিনেট একটি অনুমোদন দিয়েছে, তবে সেসব পদক্ষেপ যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে আটকাতে পারেনি। ডেমোক্র্যাটদের বিশ্বাস, যুদ্ধ শেষ হলে গ্যাসের দাম কমবে, আর তার ফলে মুদিপণ্যের দামও কমবে।
শুল্ক নিয়েও ভোট হতে পারে। কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক প্রত্যাহারে বাধা দিয়েছিলেন। প্রতিনিধি গ্রেগ স্ট্যান্টন (ডেমোক্র্যাট, অ্যারিজোনা) বলেছেন, ‘এখনই সময় (রিপাবলিকানদের) সাহস দেখিয়ে ট্রাম্পের চাপিয়ে দেওয়া এই অযৌক্তিক ও আত্মঘাতী শুল্কব্যবস্থা শেষ করার।’ তবে কোনো কোনো রিপাবলিকান পুরোনো কৌশল আঁকড়ে আছেন; প্রতিনিধি ক্রিস স্মিথ (রিপাবলিকান, নিউ জার্সি) বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, করছাঁট এবং বিগ, বিউটিফুল বিল নির্বাচকদের কাছে যথাযথ মূল্যায়ন পায়নি।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজও করবেন, আবার ভেটো ক্ষমতাও প্রয়োগ করবেন। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সংখ্যার হিসাবে। সব আসনের ফল নির্ধারিত হলে ডেমোক্র্যাটরা হাউসে ২৬০টির বেশি আসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন; সিনেটে তাঁদের ৫৪টি আসন নিশ্চিত, মিসিসিপি ও আলাস্কার ফল এখনো অনির্ধারিত। ভেটো অগ্রাহ্য করতে দুই কক্ষেরই দুই-তৃতীয়াংশ লাগে—হাউসে ২৯০ ও সিনেটে ৬৭। সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ৫৬ আসনে পৌঁছালে ৬৭-তে পৌঁছাতে ১১টি রিপাবলিকান ভোট জোগাড় করা কঠিন হতে পারে, বিশেষ করে সাবেক সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা মিচ ম্যাককনেল (রিপাবলিকান, কেনটাকি) এবং সিনেটর জন কর্নিন (টেক্সাস), বিল ক্যাসিডি (লুইজিয়ানা) ও থম টিলিসের (নর্থ ক্যারোলাইনা) মতো ট্রাম্প-বিরোধী রিপাবলিকানরা বিদায় নেওয়ায়।




