ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু আলোচনায় সতর্ক আশাবাদ আমিরাতের শীর্ষ কর্মকর্তার, যুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিলেন না

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরমাণু আলোচনা নিয়ে সতর্ক আশাবাদ প্রকাশ করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তবে যুদ্ধের আশঙ্কাও তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। কাতারের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনায় অগ্রগতি দেখছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
আমিরাতের ফেডারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ড. আলী রশিদ আল নুয়াইমি বলেন, ‘আমরা কিছুটা অগ্রগতি দেখছি। … আমরা আশা করি, দুই পক্ষই এমন একটি জায়গায় পৌঁছাতে পারবে, যেখানে তারা আস্থা গড়ে তুলতে শুরু করবে এবং যুদ্ধ এড়িয়ে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়ার পথে এগোবে। … আমি কিছুটা আশাবাদী, তবে অন্য বিকল্পটিকেও উড়িয়ে দিচ্ছি না।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ৫ নভেম্বর ইরান কাতারের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি নতুন পরমাণু প্রস্তাব জমা দিয়েছে। তবে তেহরান জোর দিয়ে বলছে, আলোচনা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে সাতটি শর্ত মানতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আমেরিকার নৌ অবরোধের অবসান।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। অন্যদিকে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, লড়াই আবার শুরু হলে তারা আরও ব্যাপক প্রতিশোধ নেবে।
এই সংঘাতের জন্য আমিরাতকে ইতিমধ্যেই বড় মূল্য দিতে হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২ নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় ইরানের তিন হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আমিরাতকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল। এসব হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মে মাসের পর আমিরাতে আর কোনো নতুন ইরানি হামলা হয়নি, তবে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কায় দেশটি সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
আল নুয়াইমি বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা করি। আমরা সেরাটার আশা করি। … আমরা সব সময় নিশ্চিত করি যে আমরা সব চ্যালেঞ্জ বা হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমিরাত নিজেকে শান্তিপ্রিয় জাতি মনে করলেও নিজের জনগণকে রক্ষা করতে দ্বিধা করবে না। তাঁর ভাষায়, ‘প্রতিটি জাতি যখন আক্রান্ত হয়, তখন তার জনগণ, তার সার্বভৌমত্ব, তার জাতিকে রক্ষা করার অধিকার থাকে।’
ইরানের শাসকগোষ্ঠী ও ইরানি জনগণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টেনে আল নুয়াইমি বলেন, ইরানি জনগণ শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা নিপীড়িত। তিনি বলেন, ‘ইরানি জনগণ সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার যোগ্য। তাদের মহান মূল্যবোধ, মহান সভ্যতা রয়েছে, এবং তারা আমাদের প্রতিবেশী।’
উদ্বেগের মধ্যেও দুবাইয়ে দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিকই মনে হয়েছে। সন্ধ্যায় শহরের কেন্দ্রে রেস্তোরাঁর বারান্দাগুলো ভরা ছিল, পর্যটকরা রাস্তায় ঘুরছিলেন এবং ঝরনার শো ঘিরে ভিড় জমেছিল। আবুধাবিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি সম্মেলন অ্যাডিপেক ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বের নানা দেশের প্রতিনিধিরা জড়ো হয়েছিলেন।
তবে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সম্মেলনের কয়েক দিন আগে এক্সনমোবিল ও শেভরনের নির্বাহীরা তাঁদের নির্ধারিত উপস্থিতি বাতিল করেছিলেন বলে ২৯ অক্টোবর রয়টার্স জানিয়েছে। তবু প্রদর্শনী হলের ভেতরে প্রতিনিধিরা বিনিয়োগ, অংশীদারত্ব ও জ্বালানি সংকটের প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে আলোচনা করেছেন।
আল নুয়াইমি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ককে বর্তমান সংঘাত বা কোনো নির্দিষ্ট মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে এই সংঘাতগুলোর মধ্য দিয়ে দেখি না, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার মধ্য দিয়ে নয়। না, এটি একটি অংশীদারত্ব। এটি একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব। এটি একটি টেকসই অংশীদারত্ব। … আমাদের মূল অংশীদারত্ব যুক্তরাষ্ট্র জাতি হিসেবে, আমেরিকান জনগণের সঙ্গে।’
তিনি বলেন, এই সম্পর্ক শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও বিনিয়োগজুড়ে বিস্তৃত এবং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে টিকে থাকার উদ্দেশ্যে গড়া। তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনের মধ্য দিয়ে দেখি না। আমাদের সম্পৃক্ততা ও অংশীদারত্ব … জাতির সঙ্গে। জনগণের সঙ্গে। … যেকোনো প্রশাসনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ও সম্পৃক্ত হওয়ার নমনীয়তা ও সক্ষমতা আমাদের আছে।’
উপসাগরীয় সরকারগুলোর জন্য এই সময়টি স্পর্শকাতর। ইরান যখন আঞ্চলিক অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে, তখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




