তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তি ঘিরে উদ্বেগ, শর্ত নিয়ে আপত্তি বিশেষজ্ঞদের
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জাপানের চারটি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়ামকে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বা বেবিচক জানিয়েছে, এই চুক্তিটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এই মাসের মধ্যেই এই চুক্তি স্বাক্ষর হবে বলেও বেবিচক জানিয়েছে।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে দর-কষাকষিতে তাদের কয়েকটি 'কঠিন শর্তে' বাংলাদেশ সরকার সম্মত হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এর মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বাকি দুইটি টার্মিনাল থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ, লভ্যাংশ ভাগাভাগি নিয়ে অসম শর্ত এবং ঢাকায় এই হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে অন্য কোনো বিমানবন্দর চালু না করার শর্তও দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশকে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সাথে যে সব শর্তে বাংলাদেশ সম্মত হয়েছে, তার অনেকগুলো বাংলাদেশের স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক।
এ নিয়ে বেসামরিক বিমানমন্ত্রী, বিমান সচিব ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যদিও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সরকার দলীয় একজন সংসদ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, 'জাপানের কোম্পানির সাথে যে চুক্তি হচ্ছে, তাতে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে।'
প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কাজ শেষ হলেও এর পরিচালনা সংক্রান্ত জটিলতায় তা এতদিন আটকে ছিল। আগামী ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বেবিচক।
বেবিচকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের এক এবং দুই নম্বর টার্মিনাল থেকেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালিত হয়। বছরে এই দুটি টার্মিনালের যাত্রী পরিচালন ক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ। অন্যদিকে, তৃতীয় টার্মিনালের বার্ষিক যাত্রী পরিচালন ক্ষমতা ধরা হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ।
বেবিচকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে শর্ত অনুযায়ী এই টার্মিনাল থেকেই আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট পরিচালিত হতে হবে। তবে, শুধুমাত্র হজ ফ্লাইট, চার্টার্ড এবং বাজেট ফ্লাইটগুলো প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল থেকে চলাচল করবে। দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী বিমানগুলোও প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল থেকে চলাচল করবে বলে জানান তিনি।
গত বুধবার বিমানমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বিমানবন্দর পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের জানান, থার্ড টার্মিনাল চালু হলেও ঢাকার দুইটি টার্মিনাল পুরোপুরি বন্ধ হবে না। সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ, চার্টার্ড ও হজ ফ্লাইট চলাচল করবে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালনা চুক্তিতে এমন শর্ত যুক্ত করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল থেকে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করা উচিত নয় বলে মনে করেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, 'হজ ফ্লাইট কিংবা চার্টার্ড ফ্লাইট অপারেশনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটের অন্য কিছু ফ্লাইটও অপারেট করতে হবে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অপারেশন এক এবং দুই নম্বর টার্মিনাল থেকে বন্ধ করা যাবে না।' বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাত্রীর সংখ্যার হিসাবে শুধু অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে পুরোনো টার্মিনালগুলোর সক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
আগামী ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম ও ফ্লাইট পরিচালনা হতে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে বলেও জানিয়েছে বেবিচক।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে মূল সংকট তৈরি হয় রাজস্ব ভাগাভাগির প্রশ্নে। বিশেষ করে জাপানি কনসোর্টিয়ামের পক্ষ থেকে রাজস্ব নিয়ে যে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, সেটি নিয়ে বেশ কয়েক দফায় বৈঠক হয়েছে বলেও জানিয়েছে বেবিচক। বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, 'জাপানি কনসোর্টিয়ামের প্রাথমিক প্রস্তাব ছিল লভ্যাংশের ১৫ শতাংশ তারা বাংলাদেশকে দেবে। সেখান থেকে বাংলাদেশ গত কয়েকদিন ধরে আলোচনা করে এই পরিমাণ আরও বাড়িয়েছে।' সেটি কি পরিমাণ বাড়িয়েছে ওই কর্মকর্তা সেই তথ্য জানাতে রাজি হননি। তবে, বেসামরিক বিমান চলাচল সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশকে ২৭ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে রাজি হয়েছে। এক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দুর্বলতাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন সরকারদলীয় এই সংসদ সদস্য।
