কেজিতে ১১ টাকা লোকসান, পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা রাজশাহীর আলুচাষিরা
রাজশাহী অঞ্চলে আর মাসখানেকের মধ্যেই আগাম আলু উঠতে শুরু করবে। অথচ এ অঞ্চলের হিমাগারগুলোতে এখনো আগের বছরের অর্ধেকের বেশি আলু অবিক্রীত রয়েছে। এ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা।
একদিকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগার খালি করার নোটিশ দিয়েছেন মালিকরা। জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে হিমাগারগুলো আগামী মৌসুমের আলু সংরক্ষণের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। অন্যদিকে বাজারে বর্তমানে আলুর পাইকারি দাম খুবই কম, মাত্র ১২ থেকে ১৪ টাকা কেজি। অথচ আলু উৎপাদন ও হিমাগার ভাড়াসহ সব মিলিয়ে কেজিপ্রতি খরচ হয়েছে ২২ থেকে ২৫ টাকা। এতে প্রতি কেজি আলুতে প্রায় ১১ টাকা লোকসান হচ্ছে। এভাবে রাজশাহীর হাজারো কৃষক ও ব্যবসায়ী পুঁজি হারাচ্ছেন।
জানা যায়, রাজশাহীতে বর্তমানে খুচরা বাজারে আলুর কেজি ১৫ থেকে ২০ টাকা। পাইকারি বাজারে দাম ১২ থেকে ১৪ টাকা। বাজারে চাহিদা ও দাম কম থাকায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা হিমাগার থেকে আলু বের করছেন না।
রাজশাহী হিমাগার মালিক সমিতি সূত্র জানায়, এ জেলায় ৩৬ হিমাগারে ৮০ লাখ বস্তায় প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে অর্ধেকের মতো আলু বের করা হয়েছে। বাকি আলুর তিন ভাগের এক ভাগ বীজ আলু হিসেবে ব্যবহৃত হবে। অর্থাৎ এখনো প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন আলু অবিক্রীত রয়েছে। এদিকে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে আগাম জাতের নতুন আলু উঠতে শুরু করবে। তখন পুরোনো আলু বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়বে।
মোহনপুর উপজেলার বসন্তকেদার গ্রামের আলুচাষি শেখ মবিনুর রহমান জানান, তিনি পবা উপজেলার উত্তরা স্টোরে ২৫০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। প্রতি কেজি আলু উৎপাদন ও হিমাগারে নেওয়া পর্যন্ত খরচ হয়েছিল ২২ থেকে ২৫ টাকা। এখন পাইকারি বাজারে প্রতি কেজির দাম ১২ থেকে ১৪ টাকা। গড়ে কেজিতে লোকসান হচ্ছে ১১ টাকা। এ দরে আলু বিক্রি করে হিমাগার ভাড়াও মেটানো যাচ্ছে না।
শেখ মবিন আরও বলেন, ‘আমার মতো হাজারো আলুচাষি এখন উভয় সংকটে পড়েছেন। আলু বের করলেও বিপদ, আবার হিমাগারে রাখলেও বিপদ। না তুললে হিমাগার মালিক নিলামে বিক্রি করে ভাড়া উসুল করবেন।’
রাজশাহী হিমাগার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান জানান, চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আলু রাখার নিয়ম। আলুর বাজার পরিস্থিতি ও চাষিদের দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে হয়তো আরও কিছুদিন রাখতে হবে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে হিমাগার খালি করতে হবে। গত বছর হিমাগারের পক্ষ থেকে আলু খালাস করার জন্য মাইকিং করা হয়েছিল। পরিস্থিতি তেমন হলে এবারও নোটিশ দিয়ে পরে মাইকিং করা হবে।
রাজশাহীর বায়া এলাকার আলু ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন বলেন, খুব বেশি হলে আর এক মাস সময় পাওয়া যাবে হিমাগার থেকে আলু তোলার জন্য। কিন্তু মাত্র এক মাসের মধ্যে বিপুল পরিমাণ আলু কীভাবে, কোথায় বিক্রি করব, সেটাই বড় প্রশ্ন। তিনি আরও জানান, তারা যে পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করেছেন, তার ৬০ শতাংশ এখনো হিমাগারেই রয়েছে। আলু খালাস করে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, হিমাগার ভাড়াও উঠছে না।
বায়ার আসমা হিমাগারের ব্যবস্থাপক আলী আশরাফ হোসেন জানান, নোটিশ দেওয়ার পরও চাষিরা আলু তুলছেন না। ৩০ ডিসেম্বরের পর আর আলু রাখা যাবে না। চাষিরা আলু না তুললে তারা নিলামে বিক্রি করে ভাড়ার টাকা উঠিয়ে নেবেন।
অন্যদিকে আলুর বর্তমান বাজারমূল্য নিয়ে চরম বিড়ম্বনার কথা জানিয়ে রাজশাহী জেলা আলু ও কাঁচামাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, গত দুই মৌসুমে রাজশাহীর আলুচাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবারও চাষিরা বিপুল লোকসানে পড়েছেন। আলু কিনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। পথে বসেছেন রাজশাহীর হাজার হাজার চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
তিনি বলেন, এ দামে আলু বিক্রি করে কোনোভাবেই খরচ তোলা সম্ভব নয়। অনেকেই আর আলু চাষ না করার কথা ভাবছেন। সরকার অনেক কিছু নিয়ে ভাবলেও আলুচাষিদের এই দুর্দশা লাঘবে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে জানান তিনি।

