রামেক হাসপাতালে ফুজির মোড়কে নকল এক্স-রে ফিল্ম, নিম্নমানের টিউব সরবরাহের অভিযোগ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ফুজি ফিল্মের মোড়কে নকল এক্স-রে ফিল্ম এবং নির্ধারিত ব্র্যান্ডের পরিবর্তে নিম্নমানের ভ্যাকুটেইনার টিউব সরবরাহ করেছে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এসব উপকরণ এখন হাসপাতালে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিল ছাড়েরও প্রক্রিয়া চলছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এক্স-রে ফিল্ম সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছিলেন রাজশাহীর ঠিকাদার মতিউর রহমান। গত ২৬ সেপ্টেম্বর তাকে ১০ বাই ১৪ ইঞ্চি আকারের ২০০ প্যাকেট এবং ১৪ বাই ১৭ ইঞ্চি আকারের ৮৫ প্যাকেট ফিল্ম সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১০ অক্টোবর তিনি এসব ফিল্ম হাসপাতালে সরবরাহ করেন।
সরবরাহ করা ছোট আকারের প্রতিটি প্যাকেটের দাম ২৫ হাজার ৬২৫ টাকা এবং বড় প্যাকেটের প্রতিটির দাম ২৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ৭২ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিল জমা দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
প্যাকেটের গায়ে ফুজি ফিল্মের লোগো থাকলেও এসব ফিল্ম নিজেদের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়নি বলে দাবি করেছে ফুজি ফিল্মের বাংলাদেশের একমাত্র পরিবেশক মেডি গ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড।
সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা রামেক হাসপাতালে গিয়ে সরবরাহ করা ফিল্ম দেখেন। মেডি গ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজার (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) রিফাত হাসান বলেন, বাংলাদেশে ফুজি ফিল্মের একমাত্র পরিবেশক তারা। দেশে যেখানেই এই ব্র্যান্ডের ফিল্ম সরবরাহ করা হোক, তা তাঁদের মাধ্যমেই যাওয়ার কথা। কিন্তু রামেক হাসপাতালে দেওয়া ফিল্ম তাদের নয়।
রিফাত হাসানের দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফুজির মোড়ক ব্যবহার করে নকল ফিল্ম তৈরি করা হয়। আসল পণ্যের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম দামে এসব ফিল্ম পাওয়া যায়। রামেক হাসপাতালে সরবরাহ করা ফিল্মও সে ধরনের বলে তাদের ধারণা।
তিনি বলেন, এসব ফিল্মে তোলা ছবির মান খারাপ হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ছবি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি এসব ফিল্ম ব্যবহারে এক্স-রে যন্ত্রেরও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার মতিউর রহমান বলেন, ফিল্ম কখনো নকল হয় না। এ নিয়ে সন্দেহ থাকলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নমুনা ঢাকায় পাঠিয়ে পরীক্ষা করাতে পারে।
ফুজি ফিল্মের অনুমোদিত পরিবেশকের কাছ থেকে না নিয়ে অন্য উৎস থেকে ফিল্ম সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি বর্তমানে মানিকগঞ্জে আছেন। সরাসরি দেখা হলে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারবেন।
অন্যদিকে রক্তের নমুনা সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত ভ্যাকুটেইনার টিউব সরবরাহেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে গেটওয়ে ইন্টারন্যাশনাল নামের আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটি আড়াই লাখ টিউব সরবরাহের কার্যাদেশ পায় গত ২৬ সেপ্টেম্বর। ১০ অক্টোবর এসব টিউব হাসপাতালে জমা দেওয়া হয়।
কার্যাদেশ অনুযায়ী জেএমআই অথবা এএনসি ব্র্যান্ডের টিউব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আড়াই লাখ টিউবের মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার পিস সরবরাহ করা হয়েছে চীনের জিআর ব্র্যান্ডের। এর মধ্যে রক্তের সিরাম পরীক্ষার জন্য ৭০ হাজার লাল রঙের এবং পূর্ণ রক্ত গণনা (সিবিসি) পরীক্ষার জন্য ৭০ হাজার বেগুনি রঙের টিউব রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রের দাবি, জেএমআই বা এএনসির তুলনায় জিআর ব্র্যান্ডের টিউবের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কম। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২০ লাখ টাকার বিল জমা দিয়েছে। অর্থাৎ কম দামে পণ্য সরবরাহ করেও বিল আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
গেটওয়ে ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা বলেন, জেএমআইয়ের টিউব সরবরাহের কথা ছিল। কিন্তু ওই সময় কোম্পানিটির কাছে পর্যাপ্ত পণ্য ছিল না। অন্যদিকে হাসপাতালেও জরুরি ভিত্তিতে টিউবের প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, তাই হাসপাতালের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রথম দফায় জিআর ব্র্যান্ডের টিউব দেওয়া হয়। পরে জেএমআইয়ের টিউবও সরবরাহ করা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রের অভিযোগ, এসব মালামাল কেনাকাটার দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. হাসানুল হাসিব। সদস্য ছিলেন সহকারী পরিচালক (অর্থ) ডা. গোলাম রব্বানী। তাদের সঙ্গে সমঝোতা করেই দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের সুযোগ পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রের দাবি, ফুজি ফিল্ম সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনুমোদিত পরিবেশকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু মতিউর রহমানের প্রতিষ্ঠান পরিবেশকের অনুমোদনপত্র ছাড়াই কার্যাদেশ পেয়েছে। অন্যদিকে জরুরি প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ডা. সাবেরা খাতুনও জিআর ব্র্যান্ডের টিউব গ্রহণে সম্মতি দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. হাসানুল হাসিব বলেন, টেন্ডারের মাধ্যমেই মালামাল কেনা হয়। কাগজপত্র ঠিক থাকলে মালামাল গ্রহণ করা হয়। এর বেশি কিছু জানতে হলে হাসপাতালের মুখপাত্র অথবা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক দফা ফোনকল করেও হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকেএম মাসুদ-উল-ইসলামকে ফোনকল করা হলে তিনি মুখপাত্রের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
মুখপাত্র ফোন ধরছেন না জানালে পরিচালক বলেন, তার সঙ্গে কিছুক্ষণ আগেই কথা হয়েছে। তিনি ফোনকল রিসিভ করবেন। এরপর আরও কয়েক দফা ফোনকল করা হলেও মুখপাত্র সাড়া দেননি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



