ঠাকুরগাঁও-১ আসনে শপথ নিলেন মির্জা ফয়সল আমিন, ব্যাংকার থেকে সংসদ সদস্য

জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন মির্জা ফয়সল আমিন। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকারের কার্যালয়ে সংসদীয় আসন-৩ (ঠাকুরগাঁও-১) এর সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁকে শপথ পড়ান জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। পেশাগত জীবনে ব্যাংকার ছিলেন তিনি; ব্যাংকের চাকরি থেকে রাজনীতির মাঠ, আর সেখান থেকে সংসদ সদস্য হয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ফয়সল আমিন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য হয়। আসনটির উপনির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পান মির্জা ফয়সল আমিন। ৮ অক্টোবর ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেন তিনি। নির্বাচনি প্রচারণায় মাদক, দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত ঠাকুরগাঁও গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেনের সঙ্গে তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পান ২ লাখ ২৭ হাজার ৯১৭ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেলাওয়ার হোসেন পান ৯৬ হাজার ৫১৩ ভোট। ১ লাখ ৩১ হাজার ৪০৪ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন ফয়সল আমিন।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা মির্জা ফয়সল আমিন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই। ১৯৬৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় মির্জা রুহুল আমিন ও ফাতেমা বেগম দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা মরহুম মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন জেলার একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক; তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৬-৮৭ সালে ভূমি ও কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও মন্ত্রী। সাত ভাই-বোনের মধ্যে ফয়সল আমিন সবার ছোট।
পরিবারের রাজনৈতিক পরিবেশে তাঁর রাজনীতির সঙ্গে পরিচয়। ১৯৭৯ সালে বাবার নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠে তাঁর হাতেখড়ি। তবে সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে তিনি লেখাপড়া শেষ করে পেশাগত জীবন শুরু করেন। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন ফয়সল আমিন। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পড়াশোনা শেষে আইএফআইসি ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
আইএফআইসি ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু হলেও ব্যাংকিং পেশার নিরাপদ ও নিশ্চিত জীবন তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। জন্মভূমি ও মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার আকাঙ্ক্ষা থেকে ১৯৯১ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরে আসেন তিনি। এরপর পুরোপুরি যুক্ত হন বিএনপির রাজনীতিতে।
ফয়সল আমিন দীর্ঘদিন ধরে জেলা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। ২০১৬ সালের আগস্টে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হন তিনি; এর আগে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ২০১৭ সালের ২৪ মে জেলা বিএনপির সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। টানা আট বছর এই দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জেলা বিএনপির সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন।
দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে ফয়সল আমিনের। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। সেই নির্বাচনে তিনি পান ১৯ হাজার ১৮৪ ভোট; তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পান ১২ হাজার ৭৪৪ ভোট। কয়েকটি কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণের পর ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি এবং ২০২১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেয়র থাকাকালে পৌর এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক পুনর্নির্মাণ ও নাগরিক সেবার বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন তিনি।
রাজনীতির বাইরে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। ২০২৬ সালের ২৫ মে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক নির্বাচিত হন ফয়সল আমিন। পরে বোর্ডের ডিসিপ্লিনারি কমিটির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। এ ছাড়া নাট্য ও ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি।
মির্জা ফয়সলের দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সম্পাদক পয়গাম আলী জানান, মির্জা ফয়সল আমিন সর্বদা একটা লক্ষ নিয়ে এগিয়েছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। পিতা ও ভাইকে অনুসরণ করে রাজনীতিতে আসা মির্জা ফয়সলের জন্য অনেক শুভকামনা জানান তিনি।
ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা একজন মানুষ, যিনি একসময় পেশাগত নিরাপত্তা ছেড়ে জন্মভূমির মানুষের পাশে দাঁড়াতে রাজনীতিতে এসেছিলেন, দীর্ঘ ৩৫ বছরের রাজনৈতিক পথচলা শেষে এবার জাতীয় সংসদে যাচ্ছেন। এখন ঠাকুরগাঁওবাসীর প্রত্যাশা, সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি জেলার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘদিনের নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।




